মৃতদেহ থেকে অঙ্গদান ও কিডনি প্রতিস্থাপন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত

সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশে মৃতদেহ থেকে অঙ্গদান ও কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত ও সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে গত ২৭ ও ২৮ জুন ঢাকায় দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনে সহযোগিতা করে কিডনি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, রাফায়েল ইন্টারন্যাশনাল, ভাইটালিংক কোরিয়া, ড্যানভিট ফাউন্ডেশন, কোডা, কোরিয়ান সোসাইটি অব ট্রান্সপ্লান্টেশন এবং কোরিয়া ইউনিভার্সিটি আনাম হাসপাতাল।
সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘লাইভ অ্যান্ড ডিসিজড ডোনর কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন’। পাশাপাশি ‘ডিসিজড অর্গান ডোনেশন অ্যান্ড অর্গান ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক একটি বিশেষ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশে মৃতদেহ থেকে অঙ্গদান কার্যক্রমের নীতিমালা, অবকাঠামো উন্নয়ন, হাসপাতালভিত্তিক অঙ্গদান ব্যবস্থা এবং কার্যকর জাতীয় অঙ্গদান কর্মসূচি গড়ে তোলার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।
প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে বলা হয়, মৃতদেহ থেকে অঙ্গদান ও কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রম সম্প্রসারণের এ উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। অঙ্গদান মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যা বহু মরণাপন্ন রোগীর জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করে। উন্নত ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সেবা সম্প্রসারণে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ও বিনিয়োগ আরও জোরদার করা হবে বলেও বাণীতে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন অধ্যাপক ড. এ. জেড. এম. জাহিদ হোসেন, এমপি। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিবছর দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ শেষ পর্যায়ের কিডনি রোগে আক্রান্ত হলেও উপযুক্ত অঙ্গের অভাবে অধিকাংশ রোগী কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ পান না। মৃতদেহ থেকে অঙ্গদান কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বহু রোগীর জীবন রক্ষা সম্ভব হবে এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। তিনি কিডনি রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষ অতিথি অধ্যাপক ড. প্রভাথ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ অনেক ক্ষেত্রে নীরব ঘাতক। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষ্য, মৃতদেহ থেকে অঙ্গদান কর্মসূচি সফল করতে হাসপাতালভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থা, ব্রেইন ডেথ নির্ণয়ের সুনির্দিষ্ট প্রটোকল এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।
অধ্যাপক কুরি আহন উল্লেখ করেন, বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে মৃতদেহ থেকে অঙ্গদানই কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রধান উৎস। বাংলাদেশেও এ কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেলে অঙ্গের সংকট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং বহু রোগী নতুন জীবন ফিরে পাবেন।
অধ্যাপক জেরেমি চ্যাপম্যান বলেন, একটি সফল মৃতদেহ থেকে অঙ্গদান কর্মসূচির জন্য সুস্পষ্ট আইন, ব্রেইন ডেথ নির্ধারণের কার্যকর ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত ট্রান্সপ্লান্ট কো-অর্ডিনেটর এবং সমাজের সর্বস্তরের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তিনি সবাইকে মরণোত্তর অঙ্গদানে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
অধ্যাপক ইন সাং মুন বলেন, সরকার, চিকিৎসক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগেই একটি টেকসই অঙ্গদান ও প্রতিস্থাপন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
সভাপতি অধ্যাপক ড. হারুন উর রশীদ বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৩ থেকে ২৪ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর নতুন করে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ কিডনি বিকল রোগে আক্রান্ত হলেও তাদের মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১২ হাজার রোগী হেমোডায়ালাইসিসের সুযোগ পান। তিনি কিডনি রোগ প্রতিরোধ, চিকিৎসা সহজলভ্য করা এবং মৃতদেহ থেকে অঙ্গদান কর্মসূচি সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে ডায়ালাইসিস-সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও উপকরণের ওপর কর ও ভ্যাট কমানোর সরকারি উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
অধ্যাপক ড. রুহুল আমিন রুবেল কিডনি রোগ প্রতিরোধ, সময়মতো চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দুই দিনব্যাপী কর্মশালায় ব্রেইন ডেথ নির্ধারণ, অঙ্গ সংগ্রহ, ডোনার কো-অর্ডিনেশন, অঙ্গদানের নৈতিক ও আইনগত বিষয় এবং হাসপাতালভিত্তিক অঙ্গদান ব্যবস্থা উন্নয়ন নিয়ে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা তাদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরেন।
আয়োজকদের আশা, এ আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও কর্মশালা বাংলাদেশের মৃতদেহ থেকে অঙ্গদান ও কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রমের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং হাজারো কিডনি রোগীর জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।




