জ্বালানি নিরাপত্তায় ‘গ্র্যান্ড প্ল্যান’ সরকারের

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় যখন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার উত্তাল, ঠিক তখনই এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ত্রিমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।
প্রথমটি হচ্ছে, জ্বালানি কূটনীতিতে বৈশ্বিক ভারসাম্য আনতে মার্কিন তিন শীর্ষ কোম্পানির কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানির গ্র্যান্ড প্ল্যান তৈরি। দ্বিতীয়ত, দেশীয় শোধনাগারের সক্ষমতা তিন গুণ বাড়িয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের (প্রায় ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা) ঋণ নিচ্ছে সরকার।
আর তৃতীয়ত, তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ সংকট সামলাতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) দেওয়া হচ্ছে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুদমুক্ত ঋণ, যা দিয়ে ফার্নেস অয়েল কেনার পথ সুগম করে দৈনিক ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বাণিজ্যিক ধারার মেগা অর্থায়ন এবং স্থানীয় ভর্তুকির বিরল মেলবন্ধন শেষ পর্যন্ত সামষ্টিক অর্থনীতিতে গড়ে তুলতে পারে স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিরক্ষা।
এদিকে জ্বালানি সংকট নিয়ে গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান ও আমদানিনির্ভরতার কারণে সৃষ্ট বর্তমান জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার।’
জানতে চাইলে এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হক বলেছেন, ‘শিল্প খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে নতুন করে বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগের চেয়ে চলমান কারখানাগুলোয় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ফার্নেস অয়েল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জরুরি ভিত্তিতে চালু এবং আগামী কয়েক বছরের জন্য সোলার, আইটি ও অবকাঠামোর মতো কম জ্বালানিনির্ভর খাতে বিনিয়োগ আনতে হবে।’
নতুন বিদ্যুৎ-জ্বালানি রোডম্যাপ: সম্প্রতি তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করে একটি সার-সংক্ষেপ মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সেখানে বলা হয়েছে, নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল এনার্জি ফোরাম-২০২৬ এবং মার্কিন তিনটি জ্বালানি সংস্থার সঙ্গে এলএনজি সরবরাহের কৌশলগত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করতে চূড়ান্ত হয়েছে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-৩০)’।
জানা গেছে, তিনটি মার্কিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এনার্জি ট্রান্সফার দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তিতে সর্বোচ্চ আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে সরকার। এ ছাড়া ফিলিপস-৬৬ প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহে আগ্রহী। আর এন্টারপ্রাইজ প্রোডাক্টস পার্টনার্স এলপি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা ও এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিয়েছে।
এ চুক্তিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি এবং ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে রিকমেন্ডেশন পাঠানো হয়েছে। উভয় মার্কিন সংস্থা থেকেই অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়াদানের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
আইডিবির সঙ্গে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ চুক্তি: এদিকে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং অপরিশোধিত তেল শোধনাগারের সীমাবদ্ধতায় নাজুক জ্বালানি নিরাপত্তা। এমন প্রেক্ষাপটে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা) ঋণ নিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আজ বৃহস্পতিবার এ নিয়ে ঢাকায় সফরে আসছেন আইডিবির প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ সুলাইমান আল জাসার। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার বৈঠক করার কথা। এরপর ১ বিলিয়ন ডলার ঋণের চুক্তি হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমবে। এতে বছরে সাশ্রয় হবে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার।
ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান ধারণক্ষমতা মাত্র ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন টন, যা দেশের ৭-৮ মিলিয়ন টনের বার্ষিক চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। প্রজেক্টের মাধ্যমে সক্ষমতা ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন টনে উন্নীত হলে দেশের ৬০-৭০ শতাংশ চাহিদা স্থানীয় শোধনাগার থেকেই মেটানো সম্ভব হবে।
জানা গেছে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ওপেকের অনমনীয় উৎপাদন হ্রাসের নীতির ফলে বৈশ্বিক পরিশোধিত জ্বালানি বাজার চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সিঙ্গাপুর ক্রুড অ্যান্ড প্রোডাক্ট বেঞ্চমার্কে প্রিমিয়াম স্প্রেড বিগত পাঁচ বছরের গড় হারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেড়েছে। অর্থাৎ, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল এবং পরিশোধিত তেলের (ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল) মূল্যের ব্যবধান বা ‘রিফাইনিং মার্জিন’ অনিয়ন্ত্রিত।
বর্তমানে তার মোট জ্বালানি তেলের সিংহভাগই আমদানি করে পরিশোধিত অবস্থায়। ফলে দেশীয়ভাবে প্রক্রিয়াজাত করার সুযোগ না থাকায় বিশ্ববাজারের এই অতিমাত্রায় প্রিমিয়াম রেটের মাশুল গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে। এ পরিস্থিতিতে ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ শুধু একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন শকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের একটি স্ট্র্যাটেজিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।
এদিকে আইডিবি ঋণের নমনীয় বা রেয়াতি নয়; সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক শর্তের একটি অনমনীয় ঋণ, যার কারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঋণসংক্রান্ত কমিটি থেকে বিশেষ অনুমোদন নিতে হয়েছে। তবে বিশ্ববাজারের বর্তমান উচ্চসুদের হারের বেঞ্চমার্ক বিবেচনায় ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ সুদের হার গ্রহণযোগ্য হলেও, টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ কিস্তি পরিশোধে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
ইআরএল ক্রুড অয়েল দেশীয়ভাবে পরিশোধনে প্রতি ব্যারেলে গড়ে প্রায় ২০ ডলার সাশ্রয় হবে। ফলে প্রতি বছর আনুমানিক ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা নিট বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও মুনাফা অর্জন হবে। এই আধুনিকায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পরিবেশবান্ধব ইউরো-৫ মানসম্পন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদিত হবে, যা বায়ুদূষণ কমাতে ভূমিকা রাখবে। এ প্রকল্পের ফাইন্যান্সিয়াল অভ্যন্তরীণ আয়ের হার ১৯ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং ইকোনমিক আইআরআর ২৩ দশমিক ২১ শতাংশ, যা প্রমিত ডিসকাউন্ট রেটের (১২%) চেয়ে অনেক বেশি। পে-ব্যাক পিরিয়ড মাত্র ৫ বছর ১ মাস, যা দ্রুত বিনিয়োগ ফেরত নিশ্চিত করে।
সংকট মোকাবিলায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ পাচ্ছে বিপিডিবি: এদিকে চলমান সংকট মোকাবিলায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিপিডিবিকে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি এ প্রস্তাব স্বাক্ষর করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ফার্নেস অয়েল (এইচএফও) ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে দৈনিক গড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল কিনতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। বিপিডিবির আর্থিক সংকট বিবেচনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ঋণ হিসেবে এ অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সূত্রমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ‘পরিচালন ঋণ’ খাত হতে এ অর্থ দেওয়া হবে। অর্থ ছাড় ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের প্রকৃত ক্ষতির বিপরীতে ২০২৭ সালের মার্চ-জুন— এ চার মাসের ভর্তুকির সঙ্গে এ ঋণ সমন্বয় করা হবে। আর এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের সঙ্গে বিপিডিবির ঋণ চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে দ্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট ২০০৬ এবং দ্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০২৫-এর বিধিবিধান পরিপালন করতে হবে।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সভায় তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দৈনিক গড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত হয়। সেটি বাস্তবায়নে ‘প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর’ পরিচালনা করতে প্রতি মাসে আনুমানিক ৬ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ টন এইচএফও প্রয়োজন। বর্তমান বাজারমূল্যে (প্রতি লিটার আনুমানিক ১০০ টাকা হিসাবে) যার মোট ব্যয় প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।





