কর্মসংস্থান নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ

সংগৃহীত ছবি
ভবিষ্যতে আমাদের রুটি-রুজির উপায় কী হবে? প্রযুক্তির ছোঁয়ায় চাকরির বাজার কতটা বদলাবে, আর সাধারণ মানুষই বা তার সঙ্গে কীভাবে খাপ খাইয়ে নেবে—এ নিয়ে তৈরি হয়েছে এক বড় ধরনের অনিশ্চয়তা।
সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে উঠে এসেছে এমনই কিছু জরুরি বার্তা।
'ওয়ার্ক ইন ফ্লাক্স: ফোরসাইট ফর দ্য ফিউচার অফ ওয়ার্ক ইন দ্য গ্লোবাল সাউথ' শীর্ষক ভার্চুয়াল আলোচনায় দেশি-বিদেশি অর্থনীতিবিদ ও শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, কাজের দুনিয়া এখন এক বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের প্রচলিত নিয়মকানুন ও সরকারি নীতিগুলো সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
আন্তর্জাতিক সংস্থা 'আইডিআরসি'র সহায়তায় এবং 'ফিউচারওয়ার্কস এশিয়া' উদ্যোগের অধীনে এই সেমিনারের আয়োজন করে সিপিডি।
এতে সহযোগিতা করেছে জাস্টজবস নেটওয়ার্ক, লার্নএশিয়া, সাউদার্ন ভয়েস এবং সিটিজেন্স প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজিস, বাংলাদেশ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বললেন, পুরোনো ধাঁচের হিসাব-নিকাশ দিয়ে এখন আর শ্রমবাজারের এই দ্রুত পরিবর্তন অনুমান করা সম্ভব নয়। তাই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রূপরেখা বুঝতে দূরদর্শী বিশ্লেষণের কোনো বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে সিপিডির বাংলাদেশ ফোরসাইট স্টাডির মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান। এই গবেষণায় আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কর্মসংস্থানে বড় ধরনের ওলটপালট ঘটাতে পারে এমন ২৭টি মূল কারণ বা চালিকাশক্তি চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষকদের মতে, সামনে বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল অর্থনীতি আরও কত দ্রুত ছড়াবে আর আমাদের নিজেদের সামাজিক চাওয়া-পাওয়া কেমন হবে, তার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। তবে পরিস্থিতি যেদিকেই যাক না কেন, পাঁচটি বাস্তবতাকে আমাদের মেনে নিতেই হবে। প্রথমত, প্রযুক্তির ব্যবহার ও ডিজিটালাইজেশন রোখা যাবে না, এটা দিন দিন বাড়বেই। দ্বিতীয়ত, সাধারণ বা কায়িক শ্রমের চেয়ে বুদ্ধিভিত্তিক ও উচ্চ-মূল্যের সেবামূলক কাজের চাহিদা বাড়বে। তৃতীয়ত, বাজারে যে ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হবে, সেই তুলনায় দক্ষ মানুষের অভাব অর্থাৎ দক্ষতার এক বড় অমিল থেকে যাবে। চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তন বা বিশ্ববাজারের মন্দার মতো ধাক্কাগুলো আমাদের বারবার সামলাতে হবে। এই নতুন সুযোগগুলো থেকে সাধারণ মানুষ কতটা লাভবান হবে, তা নির্ভর করবে আমাদের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কত দ্রুত নিজেদের আধুনিক ও চটপটে করে তুলতে পারছে তার ওপর।
ওয়েবনারে প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রোগ্রাম হেড ও এসএমই বিশেষজ্ঞ গুঞ্জন বাহাদুর দাল্লাকোটি, শ্রীলঙ্কার লার্ন এশিয়ার প্রধান নির্বাহী হেলানি গালপায়া, আর্জেন্টিনার সুর ফুতুরো ইনিশিয়েটিভের প্রধান রামিরো আলব্রিয়ু এবং ভারতের জাস্টজবস নেটওয়ার্কের সভাপতি সাবিনা দেওয়ান।
আলোচকেরা সতর্ক করে বললেন, স্বয়ংক্রিয়করণ বা অটোমেশনের কারণে সমাজে নতুন করে বৈষম্য তৈরি হতে পারে। প্রযুক্তি আসবেই, একে থামানো যাবে না। কিন্তু সাধারণ মানুষের চাকরি চলে যাবে নাকি নতুন সুযোগ তৈরি হবে, তা নির্ভর করবে সঠিক সরকারি নীতির ওপর। বিশেষ করে যারা গিগ ইকোনমি অর্থাৎ ফ্রিল্যান্সিং, রাইড শেয়ারিং বা ফুড ডেলিভারির মতো প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন, তাদের জন্য আধুনিক সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার পাশাপাশি কর্মজীবী মানুষের জন্য আজীবন নতুন নতুন কাজ শেখার বা 'রিস্কিলিং'র সুযোগ থাকতে হবে। এখন আর কেবল সমস্যা আলোচনা করার সময় নেই, বরং দ্রুত নীতিগুলো বাস্তবায়নের দিকে মন দিতে হবে। কেউ যেন এই নতুন যুগের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে, সেজন্য সরকার, ব্যবসায়ী, গবেষক ও উন্নয়ন সহযোগীদের এক হয়ে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে এই আলোচনা থেকে।




