সোনালি আঁশে স্বপ্নের বুনন
- গ্রামীণ নারীর হাতের শিল্পে মুগ্ধ নগরবাসী
- দোকান ভাড়া না নিলে কিছু লাভ হতো

ছবি: আগামীর সময়
সকাল তখন ঠিক ১০টা। রাজধানীর ফার্মগেট যেন ব্যস্ততার আরেক নাম। অফিসগামী মানুষের ভিড়, বাসের ঝুলন্ত যাত্রী, সিগন্যালে থেমে থাকা গাড়ির দীর্ঘ সারি—সব মিলিয়ে শহর তখন ছুটছে নিজের ছন্দে। সেই ব্যস্ততার মাঝেই এয়ারপোর্ট রোডের পাশে মনিপুরিপাড়ায় যেন অন্য এক দৃশ্য। রঙিন ব্যানার, পাটের গন্ধ আর হাতে তৈরি নানান পণ্যের সাজে জমে উঠেছে পাঁচ দিনব্যাপী বহুমুখী পাটপণ্যের মেলা।
জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার প্রাঙ্গণে ঢুকতেই চোখে পড়ে পাট দিয়ে তৈরি ছোট ছোট বাবুই পাখি। পাশে ঝুলছে বাবুইয়ের বাসা। কোথাও পাটের রশিতে তৈরি নকশা, কোথাও টেবিল ক্লথ, পাপোশ, ছিকা, স্কুলব্যাগ, ফাইল রাখার ব্যাগ, ফুলের টব, গালিচা—সব মিলিয়ে যেন সোনালি আঁশের এক শিল্পমেলা।
মেলার উদ্বোধনে এসেছিলেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদি। বললেন পাটপণ্যের সম্ভাবনার কথা। পরে অতিথিরা ঘুরে দেখলেন স্টলগুলো। আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই আসল প্রাণ ফিরে পায় মেলা। একের পর এক দর্শনার্থীরা ভিড় করতে থাকেন স্টলগুলোতে। কেউ পণ্য হাতে নিয়ে দেখছেন, কেউ দাম জিজ্ঞেস করছেন, আবার কেউ বিস্ময়ে তাকিয়ে আছেন— এত রূপ নিতে পারে একটি কৃষিপণ্য!
মেলার একটি কোণ জুড়ে সাজানো ছিল ‘ঐশ্বী ক্রিয়েটর’ নামের স্টল। সেখানে পাটের রশি দিয়ে তৈরি হয়েছে নানান নকশার শিল্পপণ্য। স্টলের সামনে দাঁড়িয়েই নজর কাড়ে পাটের তৈরি বাবুই পাখির বাসা। স্টলের উদ্যোক্তা মনোরমা পারভীন। তার কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস, আবার খানিকটা আক্ষেপও। তিনি জানালেন, ২০১৩ সালে মাত্র ২৮ জন নারীকে নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। এখন তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ১৬৫ জন নারী। তাদের অধিকাংশই কালিগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামের গৃহিণী। যারা বাসার কাজ শেষ করে অবসর সময় পান, তারা করেন এই কাজ। এতে বাড়তি আয় হয় তাদের।
দাম জানালেন মনোরমা। তার স্টলে একটি ছোট বাবুই পাখির দাম ২০ টাকা, আর বাবুইয়ের বাসা বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়। এ ছাড়া পাটের রশি ১২০ টাকা, পাটের টেবিল ক্লথ ও ছিকাও রয়েছে বিভিন্ন দামে।
আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘মানুষ যদি অন্তত একটা করে পাটপণ্য কেনে, তাহলে টিকে থাকবে এই শিল্প। আমরা এখানে স্টল ভাড়া দিয়েছি পাঁচ হাজার টাকা। আবার পণ্য আনতে খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। এত খরচের পর ১০-২০ টাকা লাভে ব্যবসা করা কঠিন। সরকার যদি সুযোগ না দেয়, তাহলে আমাদের জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।’
এসব পণ্য রপ্তানি করেন কি না- এ প্রশ্নে তিনি জানিয়েছেন, করোনার আগে রপ্তানি করা হলেও এখন সে সুযোগটা নেই। বিদেশি বায়াররা এত দামে কিনতে চান না এসব পণ্য। তাছাড়া জাহাজ খরচ বেশি। পণ্য পাতলা হলে জায়গা লাগে বেশি, যার কারণে নিতে চায় না অনেকে।
পাটের রঙে আধুনিকতার ছোঁয়া
আরেক পাশে ‘ইকো সোর্স বাংলাদেশ’ স্টলে বসে ছিলেন উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসান। তার স্টলে ছিল পাটের তৈরি পাপোশ, ঝুড়ি, গালিচা, ব্যাগ ও ফুলের টব। স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন অনেকেই। বিশেষ করে তরুণীরা ফুলের টব আর ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে দেখছিলেন আগ্রহ নিয়ে।
রাকিবুল হাসান জানালেন, ছোট ফুলের টব বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। বড় টবগুলোর দাম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। তিনি বলছিলেন, ‘এখন মানুষ পরিবেশবান্ধব পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাট অনেক সম্ভাবনাময়।’
তার কথার মাঝেই একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে দেখতে থাকেন রহিমা নামের এক নারী। পছন্দ হয়েছে, দামও জিজ্ঞেস করেন তিনি। জানালেন, গত বছরও এখান থেকে পণ্য নিয়েছেন। ভালো টেকসই ও সুন্দর।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে আয় করেছে প্রায় ৮২০ মিলিয়ন ডলার। যদিও ২০২০-২১ অর্থবছরে এ আয় ছিল ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার। কয়েক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয়ে ধারাবাহিক পতন দেখা গেলেও পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায় নতুন সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭০০টির মতো বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনকারী উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে। এসব খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, যার বড় অংশই নারী শ্রমিক। জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেপিডিসি) প্রায় ১১০০ উদ্যোক্তাকে সহায়তা দিয়েছে, যারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ে পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে যুক্ত। বর্তমানে প্রায় ২৮০টির বেশি পাটজাত পণ্য তৈরি করে বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। তবে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ছোট উদ্যোক্তা রয়েছেন চাপে।
মেলায় ঘুরতে এসে মুগ্ধ হয়েছেন রাজধানীর বাসিন্দা রাশিদা বেগম। সন্তানকে স্কুল থেকে আনতে গিয়ে ব্যানার দেখে ঢুকে পড়েন মেলায়। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ‘এত সুন্দর সুন্দর জিনিস পাট দিয়ে বানানো যায়, আগে জানতাম না। বিশেষ করে ফুলের টব আর ব্যাগগুলো খুব ভালো লেগেছে।’ রাশিদা বেগম শুধু দেখেই থেমে থাকেননি। কয়েকটি পণ্য হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন, দাম জিজ্ঞেস করেছেন। পরে পুরো মেলা ঘুরে যাচাই করছেন বিভিন্ন পণ্য।
মেসার্স করটিয়া তাঁত শাড়ি ঘরের মালিক বসে আছেন জামদানিসহ অন্য শাড়ি নিয়ে। এর বেশিরভাগ পাটের না; কিন্তু নিজের কারখানার তৈরি। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত অনেকে এর দাম, কালার ও কাপড় দেখে পছন্দ করেছেন। বিকেলে ক্রেতা বাড়বে।
‘নেচারটেক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের স্টলে দেখা যায় পাটের তৈরি গৃহসজ্জার পণ্য। প্রতিষ্ঠানটির মালিক শফিউল্লাহ নিরব জানান, তাদের কারখানা রাজধানীর মুগদায়। তার স্টলে ছিল পাটের কাপড় ও ব্যাগের সমাহার। ‘বিদেশেও এখন চাহিদা বাড়ছে পাটপণ্যের। কিন্তু কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে উৎপাদন খরচও,’ বলছিলেন তিনি। স্টলের বিক্রেতা জানালেন, এক হাজার টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামের পণ্য রয়েছে তাদের কাছে।
একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল পাট। ‘সোনালি আঁশ’ নামে পরিচিত এই ফসল এখন আবার নতুন করে সম্ভাবনার আলো দেখাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায় পাটপণ্যও পাচ্ছে নতুন বাজার।







