তেলের দাম বৃদ্ধির পর ৪৫০০ কোটি টাকা ঋণ পেল বিপিসি

ফাইল ছবি
জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি রেকর্ড ২০ টাকা করার ৯ দিনের মাথায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ দিচ্ছে সরকার। দীর্ঘ ১১ বছর পর এমন ঋণ পাচ্ছে সংস্থাটি।
গত মঙ্গলবার এ অর্থ ছাড়ের অনুমোদন দিয়েছে অর্থ বিভাগ। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ‘পরিচালন ঋণ’ খাতের বরাদ্দ অর্থ থেকে এ টাকা দেওয়া হবে। এ বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের ডিডিওর অনুকূলে অথরিটি জারির মঞ্জুরি আদেশ দেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে বিপুল পরিমাণ লোকসান গুনতে হচ্ছে বিপিসিকে। প্রতিষ্ঠানটি মারাত্মক আর্থিক চাপে পড়ার কারণে এই অর্থায়ন করা হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের আদেশ অনুযায়ী, ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিপিসির সুদমুক্ত ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। আগামী পাঁচ বছরে ষান্মাসিক কিস্তিতে এ অর্থ পরিশোধ করতে হবে। প্রথম ছয় মাস থাকবে গ্রেস পিরিয়ড। ঋণের বিপরীতে অর্থ বিভাগের সঙ্গে বিপিসিকে চুক্তিও করতে হবে।
এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হয়। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা করা হয়েছে। চার ধরনের জ্বালানির দাম একসঙ্গে ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘটনা দেশে নজিরবিহীন।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত থাকায় আন্তর্জাতিক দরের সঙ্গে ব্যবধানের কারণে এ লোকসান হয়েছে।
নতুন দাম কার্যকর হলে বিপিসির বার্ষিক ঘাটতি ও লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমতে পারে। তবে আমদানি ব্যয় মেটাতে তাৎক্ষণিক অর্থের প্রয়োজন থাকায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার এই অর্থায়ন করছে।
অর্থ বিভাগের আদেশে বলা হয়েছে, অর্থ অনুমোদিত ব্যয় খাত ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬ ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০২৫-সহ সব আর্থিক বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
এই অর্থায়ন বিপিসির তাৎক্ষণিক জ্বালানি আমদানির দায় মেটাতে সহায়তা করবে দাবি বিপিসির। কারণ হিসেবে এর আগে বিপিসি বলেছিল, নতুন অর্থায়ন না পেলে অক্টোবর মাসেই জ্বালানি আমদানির জন্য এলসি (ঋণপত্র) খোলার মতো প্রয়োজনীয় তহবিল ফুরিয়ে যেতে পারে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগকে পাঠানো ৮ সেপ্টেম্বরের এক চিঠিতে বিপিসি তার লোকসানকে সরকারি ভর্তুকি হিসেবে পুনঃপরিশোধের দাবি জানায়। দেশীয় বাজারে তেলের দাম না বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণেই মূলত এই লোকসান হয়েছে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করে।
আইএমএফের ঋণের শর্ত অনুযায়ী জ্বালানি তেলের একটি স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু মার্চে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইনে চাপ পড়ার পর থেকে সরকার সাধারণ গ্রাহকদের বৈশ্বিক ধাক্কা থেকে রক্ষা করতে অভ্যন্তরীণ বাজারে বৈশ্বিক মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুরোপুরি দাম বাড়ায়নি।
তবে ২০ সেপ্টেম্বর সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর সরকার এখন এই সুদমুক্ত পরিচালন ঋণ দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরদিন জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ‘স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে প্রয়োগ করা হলে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম হতো প্রায় ২০৫ টাকা। বিপিসি বিগত বছরগুলোতে অর্জিত নিজস্ব তহবিল দিয়ে এ লোকসান সামাল দিতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদি চাপের কারণে তাদের সেই সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে।’
ধারাবাহিক পরিচালন লোকসান মেটাতে প্রতিষ্ঠানটি ঐতিহাসিকভাবেই সরকারি ঋণ ও ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম মারাত্মক কমে যাওয়ার পর বিপিসির আর্থিক চিত্রে আমূল পরিবর্তন আসে।
২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিপিসি প্রতিবছর ৫ হাজার কোটি থেকে ৯ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত মুনাফা করেছে। কেবল ২০২১-২২ অর্থবছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে এক হাজার ৯৮৩ কোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়েছিল।
তবে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরু হওয়ার পর মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে আমদানীকৃত জ্বালানির এলসি নিষ্পত্তি করতে গিয়ে বিপিসির ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয় বলে ৮ সেপ্টেম্বরের চিঠিতে বলা হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতের অধীনে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে নগদ ঋণ দেওয়ার জন্য ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল সরকার। এ ধরনের বরাদ্দ নিয়মিতভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরের ২ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩৫৭ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের অর্থ কাগজে-কলমে ঋণ হিসেবে দেওয়া হলেও গ্রহীতা সংস্থাগুলো নানা অসুবিধার কথা তুলে ধরে প্রায়শই তা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে এই ঋণ শেষ পর্যন্ত সরকারের ভর্তুকির বোঝা বাড়িয়ে দেয়।
বিদ্যমান জ্বালানি ভর্তুকির প্রতিশ্রুতির কথা বিবেচনায় নিলে এই চাপ বেশ উল্লেখযোগ্য। সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি হিসেবে ৪২ হাজার কোটি টাকা বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়। তবে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে।




