ঘাটতি মেটাতে নতুন কৌশল ‘সুকুক বন্ড’

আসন্ন বাজেটে আয় ও ব্যয়ের ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। প্রতি বছরই দাতা সংস্থা ও দেশের ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এ ঘাটতি মেটানো হয়। কিন্তু আগামীতে এই ঋণের বিকল্প উৎস হিসেবে নির্মিত, নির্মাণাধীন সেতু ও বড় অবকাঠামোর নামে বন্ড ছেড়ে সেখান থেকে অর্থ সংগ্রহে নজর দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে পদ্মা, যমুনাসহ সব ধরনের সেতু ও বড় অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামি বন্ড ‘সুকুক’ ইস্যু করতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেখানে দেশীয় ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের টানার পরিকল্পনা আছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
আরও জানা গেছে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠক থেকে নির্মিত, নির্মাণাধীন সেতু ও অবকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ সম্পদ তালিকা তৈরি করতে সেতু কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণাধীন ও কাজ শেষ হয়েছে— এমন সেতু, অবকাঠামোর প্রকল্প এবং স্থাপনার বিপরীতে সুকুক বন্ড ছাড়ার ব্যাপারে সেতু কর্তৃপক্ষের সম্মতি চাওয়া হয়।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ আয়ের বিপরীতে বন্ড ইস্যুর বিষয়ে সরকার চিন্তা করছে। এ পদ্ধতিতে বিনিয়োগকারীরা অর্থ দেবে এবং সে অর্থ উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করতে পারবে সরকার। পরে এই বন্ড ক্যাপিটাল মার্কেটে লেনদেন করা যাবে। ভারতে এ ব্যবস্থা পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। আমরাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি।
এদিকে বন্ড ইস্যু প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয়েছে বলে আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছেন সেতু সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ। বিভিন্ন সেতু ও বড় অবকাঠামোর বিপরীতে বন্ড ইস্যুর অবস্থা তৈরি হয়েছে— যোগ করলেন তিনি।
সূত্র মতে, একটি স্বতন্ত্র আইনের অধীনে সেতু কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত। সেক্ষেত্রে বন্ড ছাড়তে অনেক ধরনের দলিলাদি ও ডকুমেন্ট তৈরি করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ কাজ শুরু করেছে। সেটি সম্পন্ন হলে অর্থ বিভাগের কাছে দলিলাদিসহ সুপারিশ পাঠাবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর প্রয়োজনীয় দলিলাদি, ডকুমেন্টস ও চুক্তিপত্র অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে উপযুক্ত সেতু ও অবকাঠামো বাছাই করে সুকুক বন্ড ইস্যু করবে সরকার। এদিকে কোন সেতু থেকে কত আয় হচ্ছে, কোনটির অর্থনৈতিক ব্যবহার বেশি, কোথায় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কেমন— তা খতিয়ে দেখছে অর্থ বিভাগ।
বিশ্বের অনেক দেশ আরও আগেই এ ধরনের বন্ড ইস্যুর দিকে গেছে। ২০১৭ সালে ‘সভরেইন সুকুক’ ইস্যু করে সড়ক ও সেতু নির্মাণে ১ ট্রিলিয়ন নাইরার (নাইজেরিয়ান মুদ্রা) তুলেছে নাইজেরিয়া সরকার। সর্বশেষ ২০২৫ সালে ৩০০ বিলিয়ন নাইরার সুকুক ছাড়া হয়।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বে প্রথম সার্বভৌম গ্রিন সুকুক ইস্যুকারী দেশগুলোর একটি। আর বড় সুকুক বাজারগুলোর একটি হচ্ছে মালয়েশিয়া। আবুধাবির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এডনন্স গত বছর ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সুকুক ছাড়ে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সামলাতে গত বছর ২ বিলিয়ন ডলারের বন্ড ছেড়েছে মিসর।
বাংলাদেশও ২০২০ সাল থেকে সীমিত আকারে দীর্ঘমেয়াদি সুকুক বন্ড ইস্যু করে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। সম্প্রতি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুকূলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার একটি বাণিজ্যিক সুকুক ইস্যু করা হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে যে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, এর বিপরীতে বছরে সোয়া লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে শুধু সুদ পরিশোধে। এর সঙ্গে আসল যুক্ত হলে দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। বিষয়টি তুলে ধরে অর্থ বিভাগের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঘাটতি মোকাবিলায় ঋণের উৎসে বৈচিত্র্য আনার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে ঋণের ব্যয় ও ঝুঁকি কমানো এবং আর্থিক খাত উন্নয়নে দেশে আর্থিক বাজারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ অতিরিক্ত দেশীয় ঋণ নেওয়ার ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ গ্রহণের সুযোগ সংকুচিত এবং বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ প্রেক্ষাপটে আর্থিক খাত থেকে শরিয়াহভিত্তিক সুকুক বন্ডের মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেখানে আরও বলা হয়, সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবকাঠামো প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে পারে।
এই বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা প্রকল্পের সম্পদ-সম্পত্তির অংশীদার হওয়ায় এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হিসাব এবং ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এসএলআর (বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণ হার) পূরণ করার মতো ঝুঁকিমুক্ত খাত বাজারে স্বল্পতা রয়েছে। ফলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ প্রভাবিত না করে সুকুক ছাড়া পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সুকুক বন্ডের বাজারে দ্রুত সম্প্রসারণের সম্ভাবনা আছে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারে এবং অর্থায়নের উৎসে বৈচিত্র্য আনে। এটি শরিয়াহসম্মত অর্থায়ন মাধ্যম, যা ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য ও আকর্ষণীয় সুযোগও সৃৃষ্টি করে।
সূত্র মতে, পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু (মুক্তারপুর সেতু) ও কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বহু লেনের টানেল নির্মাণ অবকাঠামো শেষ হয়েছে। এসবের ওপর চাইলে সরকার দ্রুত বন্ড ছাড়তে পারবে।
এ ছাড়া চাঁদপুর-শরীয়তপুর সড়কে ও গাজীপুর-মুন্সীগঞ্জ সড়কে মেঘনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হচ্ছে। এর বাইরে বেশ কিছু সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়াধীন। যেমন— দ্বিতীয় যমুনা সেতু, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর সেতু, মেঘনা নদীর ওপর সেতু (শরীয়তপুর-চাঁদপুর সড়কে), ঢাকা ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, দ্বিতীয় মুক্তারপুর সেতু, মেঘনা নদীর ওপর সেতু (ভুলতা-আড়াইহাজার-বাঞ্ছারামপুর সড়ক) ও ঢাকা এলিভেটেড ইনার সার্কুলার রিংরোড (পূর্ব অংশ) প্রকল্প। এসব প্রকল্পও সুকুক বন্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা আছে।




