সরকারি ব্যয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ
- আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক তুলনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি ব্যয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। মানসম্মত ব্যয় তো অনেক দূরের বিষয়, টাকা খরচের অঙ্কের দিক দিয়ে সবার পরে নাম এসেছে। এক্ষেত্রে সাত দেশের তুলনামূলক পর্যালোচনা করে অর্থ বিভাগ দেখিয়েছে এমন চিত্র।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
এ প্রসঙ্গে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ আগামীর সময়কে বলেছেন, আমাদের দেশে সরকারি বরাদ্দ যা হয় তার চেয়ে আরও কম ব্যয় হয়। আবার যা ব্যয় হয় তারও মান নিয়ে প্রশ্ন থাকে। এক্ষেত্রে প্রধান কারণ হলো আমলাতন্ত্রের দক্ষতার অভাব এবং দুর্নীতি। দুর্নীতি দুই ধরনের— এক, আর্থিক, দুই, প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা পর্যায়ের কর্মকর্তারা সঠিক দায়িত্ব পালন করেন না। যতটা সময়, দায়িত্বশীলতা ও একাগ্রতা নিয়ে কাজ করার কথা, তা না করাটাও অন্যতম দুর্নীতি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ কঠিন। তবে উপায় হলো রাজনৈতিক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
অর্থ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক মানদণ্ড বিবেচনায় বাংলাদেশে সরকারি ব্যয়ের হার এখনো তুলনামূলকভাবে কম। আইএমএফের ওয়াল্ড ইকোনমিক আউটলুকে আন্তঃদেশীয় উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশের সরকারি ব্যয় ভারত, ভুটান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল ও পাকিস্তানের মতো অর্থনীতির দেশগুলোর চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর অন্যতম কারণ হলো, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিন ধরে বাজেট ঘাটতি সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতা।
সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে জার্মানি প্রায় ৬০ শতাংশ সরকারি ব্যয় করে থাকে। ভারত করে প্রায় ৪০ শতাংশ, মালয়েশিয়া প্রায় ৩০, থাইল্যান্ড প্রায় ২৫, ভিয়েতনাম প্রায় ২৪ এবং কম্বোডিয়া ব্যয় করে প্রায় ২২ শতাংশ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারি ব্যয় করে প্রায় ১৭ শতাংশ।
অর্থ বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, রাজস্ব আহরণে টেকসই বৃদ্ধি নিশ্চিত করা না গেলে অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় মাত্রায় অর্থায়ন করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে পরিমাণ সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার জন্য পর্যাপ্ত রাজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।
আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের বাজেট বরাদ্দের প্রবৃদ্ধি সমভাবে হয়নি। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, চাহিদাজনিত চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ গ্রহণের ব্যয় সীমিত রাখার লক্ষ্যে ব্যয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দেও এ সতর্ক অবস্থানের প্রতিফলন আছে। তবে মধ্যমেয়াদি প্রক্ষেপণে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে মূলধন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয় ধীরে ধীরে বাড়ানো হচ্ছে। তবে এ ব্যয় সম্প্রসারণ কতটা প্রবৃদ্ধি সহায়ক হবে, তা নির্ভর করবে ব্যয়ের গুণগত মানের ওপর। প্রকল্প বাছাই যথাযথ না হলে, বাস্তবায়নের সক্ষমতা দুর্বল থাকলে এবং অর্থছাড় ও নগদ প্রবাহ ব্যবস্থাপনা বাস্তবসম্মত না হলে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধিই কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। এজন্য মধ্যমেয়াদে বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগতমান, বাস্তবায়ন শৃঙ্খলা এবং অর্থ ব্যবহারের দক্ষতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাজেট বরাদ্দ এবং প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান থাকলে বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ও কার্যকারিতা উভয়কে দুর্বল করে। একই সঙ্গে সরকারি সম্পদের দক্ষ ব্যবহারও বাধাগ্রস্ত হয়। এ ধরনের ব্যবধানের পেছনে সাধারণত অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী প্রকল্প পরিকল্পনা, অনুমোদন পর্যায়ে প্রকল্পের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির ঘাটতি, ক্রয় প্রক্রিয়ায় দেরি, ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে অগ্রাধিকার পরিবর্তনের মতো কারণ কাজ করে। মধ্যমেয়াদে সরকারের লক্ষ্য হবে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও জনকল্যাণে অধিক অবদান রাখতে সক্ষম প্রকল্পে বরাদ্দ অব্যাহত রাখা এবং কম গুরুত্বপূর্ণ, দেরি বা পর্যাপ্ত প্রস্তুতিহীন প্রকল্পে বরাদ্দ পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগতমান বৃদ্ধি করা হবে। এর ফলে সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা বাড়বে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।




