ড. সেলিম রায়হান
লক্ষ্য সঠিক রোডম্যাপ দুর্বল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাজেটে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাত, রাজস্ব আহরণ ও কর্মসংস্থানের মতো সংকটগুলোর স্বীকৃতি থাকলেও মোকাবিলায় কঠিন সংস্কার এবং রাজনৈতিক সাহসের স্পষ্ট প্রতিফলন নেই। ফলে এটি আংশিকভাবে সংকট মোকাবিলার বাজেট, তবে সংকটকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকিও বহন করছে। আগামীর সময়ের কাছে প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে এভাবে মূল্যায়ন করেছেন অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিজনেস এডিটর মিজান চৌধুরী।
প্রশ্ন: জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়লে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশে উঠতে এবং প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় বাজেটে কার্যকর রোডম্যাপ আছে কি?
সেলিম রায়হান: দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি-নিম্ন প্রবৃদ্ধি ঝুঁকির মুখে আছে। বাজেট ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়েছে; কিন্তু ঝুঁকি বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে জ্বালানি ধাক্কায় মূল্যস্ফীতি ৯.১ এবং প্রবৃদ্ধি ৪.৫ শতাংশে নামতে পারে। অর্থাৎ সরকারের নিজস্ব হিসাবেই ঝুঁকি বড়। সামাজিক সুরক্ষা, কর ছাড়, জ্বালানি সরবরাহ, আমদানি ব্যবস্থাপনা ও বাজার স্থিতিশীলতার কথা আছে। কিন্তু তা পূর্ণাঙ্গ মূল্যস্ফীতি রোডম্যাপ নয়। খাদ্যবাজার, পরিবহন ব্যয়, মজুদ, প্রতিযোগিতা, বিনিময় হার, জ্বালানি মূল্য ও মুদ্রানীতিকে একসঙ্গে ধরার স্পষ্ট কৌশল দরকার ছিল। উদ্বেগের বিষয়, প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য ব্যয় ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে, আবার মূল্যস্ফীতি কমাতে চাহিদা সংযমও দরকার। এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জের সমাধান বাজেটে যথেষ্ট পরিষ্কার নয়। তাই ঝুঁকি বাস্তব, প্রস্তুতি আংশিক।
প্রশ্ন: জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তেল মজুদ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা আমদানি উৎস বৈচিত্র্যের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, নাকি ‘প্রতিক্রিয়াশীল অর্থনীতি’ হিসেবেই রয়ে গেছি?
সেলিম রায়হান: মধ্যপ্রাচ্য সংকট দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশ এখনো বহিঃধাক্কায় খুব নড়বড়ে। বাজেট জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি সরবরাহ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দক্ষ ব্যবহারের কথা বলেছে। দিকটি সঠিক। কিন্তু কৌশলটি প্রতিরোধমূলক কম, প্রতিক্রিয়াশীল বেশি। তেল মজুদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য, কৌশলগত রিজার্ভের অর্থায়ন, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির গ্রিড সক্ষমতা, শিল্পের জন্য জ্বালানি দক্ষতা প্যাকেজ এবং জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি-বণ্টন নিয়ে আরও স্পষ্ট পরিকল্পনা দরকার ছিল। শুধু সরবরাহ ধরে রাখা বা দাম সমন্বয়ের ভাষা যথেষ্ট নয়। এই বাজেট সেই দুর্বলতা পুরোপুরি কাটাতে পারেনি।
প্রশ্ন: বাজেট ব্যাংক খাত সংস্কারের বাস্তব কোনো বার্তা দিয়েছে, নাকি সংকট আরও দীর্ঘায়িত ঝুঁকি তৈরিতে ইঙ্গিত দিচ্ছে?
সেলিম রায়হান: বাজেট ব্যাংক খাতের সংকট স্বীকার করেছে। খেলাপি ঋণ, দুর্বল মূলধন, আমানতকারীর আস্থা, পুনর্মূলধনীকরণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু স্বীকারোক্তি সংস্কার নয়। ব্যাংক থেকে সরকারি ঋণ নেওয়া অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে। পুনর্মূলধনীকরণও ঝুঁকিপূর্ণ, যদি তা সুশাসন, সম্পদ উদ্ধার, দায় নির্ধারণ, বোর্ড সংস্কার ও ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ছাড়া হয়। বাজেট বাস্তব সংকেত দিত, যদি দুর্বল ব্যাংকগুলোর নিরীক্ষা, ঋণ পুনরুদ্ধার, মালিকানা প্রভাব এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন প্রয়োগক্ষমতার সময়সূচি দিত। বর্তমানে ঝুঁকি রয়ে গেছে যে সংকট দীর্ঘায়িত হবে, আর সরকারি ঋণ বেসরকারি বিনিয়োগকে আরও কোণঠাসা করবে।
প্রশ্ন: রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত? কাঠামোগত কর সংস্কার ছাড়া বাজেট কি ঋণনির্ভর ব্যয়ের দলিলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে?
সেলিম রায়হান: রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাজেটের সবচেয়ে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশ। দুর্বল প্রবৃদ্ধি, আমদানি চাপ, অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি, কর ফাঁকি, মামলা এবং করদাতা আস্থার সংকটের মধ্যে এত বড় উল্লম্ফন বাস্তবসম্মত মনে হয় না। সংস্কার ছাড়া রাজস্ব বাড়ানো কঠিন। ডিজিটাইজেশন, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, করনীতি ও কর প্রশাসন পৃথক করা, কর ছাড় পর্যালোচনা প্রয়োজনীয়, কিন্তু রাতারাতি ফল দেবে না। একই সঙ্গে বাজেট বিস্তৃত বিনিয়োগ প্রণোদনা, কর ছাড় ও শুল্ক ছাড় দিয়েছে। ফলে রাজস্ব বাড়ানো ও ছাড় বাড়ানোর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। সাধারণ করদাতার ওপর বোঝা বাড়ার আশঙ্কাও আছে। বড় সম্পদ, উচ্চ আয়, কর ফাঁকি, অপ্রদর্শিত সম্পদ ও কর ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব না ধরলে ছোট ব্যবসা, পাইকারি বিক্রেতা, এসএমই এবং মধ্যবিত্তরাই বেশি চাপে পড়বেন। রাজস্ব কম উঠলে বাজেট শেষ পর্যন্ত ঋণনির্ভর ব্যয়ের দলিলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। উন্নয়ন ব্যয় কাটছাঁট, বকেয়া বিল, ব্যাংক ঋণ এবং সুদ ব্যয় তখন আরও বাড়বে।
প্রশ্ন: প্রস্তাবিত বাজেট কি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সুরক্ষার বার্তা দিয়েছে?
সেলিম রায়হান: বাজেটে মানুষের কষ্ট স্বীকার করেছে, কিন্তু সুরক্ষার বার্তা অসম্পূর্ণ। সামাজিক সুরক্ষা, ফ্যামিলি কার্ড, নিত্যপণ্যে কিছু কর ছাড়, করমুক্ত আয়সীমা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য বরাদ্দ এবং উদ্যোক্তা সহায়তা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু বাস্তব স্বস্তি নির্ভর করবে বাজারদর, ভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন ও কর্মসংস্থানের ওপর। পরোক্ষ করের বিস্তার, জ্বালানি মূল্য সমন্বয়, ব্যাংক ঋণনির্ভর ঘাটতি এবং দুর্বল বাজার তদারকি নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। ফ্যামিলি কার্ড বা ভাতা দরকার; কিন্তু সেগুলো যদি মূল্যস্ফীতির তুলনায় ছোট হয়, তাহলে জীবনযাত্রার খরচ কমবে না। বাজেট এখনো অনেকাংশে আয়-ব্যয়ের হিসাবেই আটকে আছে; নিম্ন ও মধ্যবিত্তের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার পূর্ণ সামাজিক নীতি হয়নি।
প্রশ্ন: বাজেট কি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির দিকনির্দেশনা দিয়েছে, নাকি প্রবৃদ্ধির সুফল সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যেই আটকে থাকার ঝুঁকিতে আছে?
সেলিম রায়হান: বাজেট অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ভাষা ব্যবহার করেছে। আঞ্চলিক বিনিয়োগ, সামাজিক সুরক্ষা, নারী উদ্যোক্তা, এসএমই, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, ফ্রিল্যান্সিং, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো সুযোগের বিস্তার ঘটাতে পারে। কিন্তু অন্তর্ভুক্তি শুধু ঘোষণায় হয় না। দরকার সম্পদ বণ্টন, কর ন্যায্যতা, মানসম্পন্ন সরকারি সেবা, সস্তা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার মান, শ্রমবাজারে প্রবেশ এবং বড় গোষ্ঠীর কর সুবিধা সীমিত করা। এসবের পূর্ণ বণ্টনগত বিশ্লেষণ দেয়নি। আঞ্চলিক বিনিয়োগের প্রণোদনা আছে; কিন্তু স্থানীয় অবকাঠামো, দক্ষতা, বিদ্যুৎ, জমি ও বাজার সংযোগ ছাড়া তা কাজ করবে না। ফলে প্রবৃদ্ধির সুফল আবারও সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে আটকে থাকার ঝুঁকি আছে।
প্রশ্ন: এই বাজেট ‘জবলেস গ্রোথ’-এর ঝুঁকি আরও উসকে দেবে?
সেলিম রায়হান: বাজেটে কর্মসংস্থানের কথা আছে; কিন্তু চাকরি সৃষ্টির সুস্পষ্ট মেগা পরিকল্পনা দুর্বল। তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, আইসিটি, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি ও এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। এগুলো সহায়ক, কিন্তু যথেষ্ট নয়। শিক্ষিত বেকারত্বের সমস্যা বহুমাত্রিক। সবাই ডিজিটাল খাতে যাবে না। দরকার শ্রমঘন শিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্থানীয় সেবা, নির্মাণ, পর্যটন, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ এবং জেলাভিত্তিক দক্ষতা মানচিত্র। বাজেট এই বৃহৎ কর্মসংস্থান সেতুবন্ধ দেখায়নি। বিনিয়োগ স্থবির থাকলে প্রবৃদ্ধি হলেও আমদানিনির্ভর হতে পারে, শ্রম-শোষণকারী নয়। তাই জবলেস গ্রোথের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
প্রশ্ন: এ বাজেট সংকট মোকাবিলার, নাকি সংকট ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়ার বাজেট?
সেলিম রায়হান: সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত সত্য হলো, সরকার কঠিন স্বার্থগোষ্ঠীর মুখোমুখি হতে কতটা প্রস্তুত। কর ছাড় কমানো, বড় কর ফাঁকি ধরা, খেলাপি ঋণের দায় নির্ধারণ, অদক্ষ ভর্তুকি সংস্কার, সক্ষমতা চার্জ ও জ্বালানি চুক্তি পর্যালোচনা এবং অপচয়ী প্রকল্প বাদ দেওয়া— এসব কঠিন সিদ্ধান্ত। এগুলোর ভাষা দিয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক সাহসের পরিষ্কার প্রমাণ কম। এটি আংশিকভাবে সংকট মোকাবিলার বাজেট, কিন্তু একই সঙ্গে সংকট ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকিও রাখে। লক্ষ্যগুলো সঠিক, কিন্তু রোডম্যাপ দুর্বল। রাজস্ব অতিরিক্ত আশাবাদী, ব্যাংক সংস্কার অসম্পূর্ণ, মূল্যস্ফীতি নীতি অস্পষ্ট, কর্মসংস্থান পরিকল্পনা বিচ্ছিন্ন। তাই সাফল্য নির্ভর করবে বাজেটোত্তর সিদ্ধান্তের ওপর।




