স্বাস্থ্যখাতে দ্বিগুণ বরাদ্দের প্রস্তাব

সংগৃহীত ছবি
দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বোচ্চ জোর দিয়েছে সরকার। বিগত সরকারের আমলে অবকাঠামো নির্মাণ ও চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ে হওয়া ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের অবসান ঘটিয়ে জনমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
নতুন বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য সর্বমোট ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা দেশের মোট জিডিপির ১.০১ শতাংশ। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা (জিডিপির ০.৫৮ শতাংশ)। অর্থাৎ, গত অর্থবছরের তুলনায় এবার স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ একলাফে প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য এই বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা।
১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগ
দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণ ও সেবার মান বাড়াতে অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশব্যাপী মানসম্মত ও প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যার বড় একটি অংশ অর্থাৎ ৮০ শতাংশই হবেন নারী। এছাড়া শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ৪ মাস মেয়াদি ‘জেনারেল কেয়ারগিভার’ প্রশিক্ষণ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় দেশের প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের অধীনে একটি করে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়া হবে। এছাড়া চিকিৎসা-কেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে সরে এসে রোগ প্রতিরোধ-কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে নতুন স্বাস্থ্যনীতির মূল উদ্দেশ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সহজলভ্য করতে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে।
অন্যদিকে করোনারি কেয়ার ও কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত করার পরিকল্পনা জানানো হয়েছে। রোগী পরিবহনের দুর্দশা লাঘবে একটি ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠন করার কথাও বাজেটে জানানো হয়।
বিগত সরকারের টিকাদান কর্মসূচিতে অবহেলার কারণে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যু মোকাবিলায় নতুন সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই প্রায় শতভাগ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া চিকিৎসা শিক্ষাকে আধুনিক করতে ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার পদ্ধতি এবং এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করে একটি ভবিষ্যৎমুখী নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালু করা হবে। একই সঙ্গে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি খাতে উচ্চশিক্ষা ও প্রফেশনাল ডিগ্রি (ব্যাচেলর ও মাস্টার্স) অর্জনের সুযোগ আরও বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
ওষুধ শিল্পে প্রণোদনা ও পুষ্টির ওপর জোর
এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশীয় ওষুধ শিল্পের ধারাবাহিক বিকাশ, উদ্ভাবন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান সুদৃঢ় করতে প্রয়োজনীয় আর্থিক প্রণোদনা ও সহায়ক নীতিগত সুবিধা দেবে সরকার। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় ওষুধ ও টিকা পৌঁছাতে দেশব্যাপী একটি টেকসই ও আধুনিক ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি ৫ বছরের নিচের শিশুদের খর্বাকৃতি দূর করতে একটি বহুমুখী ও সমন্বিত জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।









