খেলাপি ঋণ কিনবে বিশেষ কোম্পানি!
- পুনর্গঠন, পুনঃ তফসিল, জামানত বিক্রি ও ঋণকে
- শেয়ারে রূপান্তরের ক্ষমতা পাবে কোম্পানি
- খেলাপি সম্পদ উদ্ধারে গঠন হবে বিশেষ টাস্কফোর্স
- প্রথমবার গড়ে উঠবে খেলাপি ঋণের সেকেন্ডারি মার্কেট
- দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিয়ে গঠন হবে বিশেষ তহবিল

প্রতীকী ছবি
পাহাড় সমান খেলাপি ঋণই এখন ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সংকট। এটি দীর্ঘদিন চাপের মুখে রাখছে অর্থনীতিকে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ বিক্রির জন্য গঠন করা হচ্ছে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ (ডিএএমসি)। যার মাধ্যমে ঋণ কেনাসহ পুনর্গঠন, পুনঃ তফসিল, জামানত দখল, সম্পদ বিক্রি, আদালতে মামলা পরিচালনা, প্রয়োজনে ঋণকে শেয়ারে রূপান্তরও করা হবে। প্রয়োজনে রুগ্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, আধুনিকায়ন ও নতুন বিনিয়োগের ব্যবস্থাও করতে পারবে।
ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের জন্য ‘ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা-২০২৬’ নামে একটি নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় এই আইনের খসড়া প্রণয়ণ করেছে। ওই আইনে আরও যে কাজ করতে পারবে সেটি হলো— খেলাপি ঋণ কিনতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন ফান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে বিনিয়োগ তহবিল গঠন করা।
তবে ‘ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’কে নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে একটি স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রক ইউনিট গঠন থাকবে। পাশাপাশি খেলাপি সম্পদ দ্রুত উদ্ধার ও বাস্তবায়নের জন্য গঠন করা হবে ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স। ওই টাস্কফোর্সকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি দিতে সব সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বাধ্য থাকবে— এমন বিধান যুক্ত হচ্ছে ওই আইনে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী আগামীর সময়কে বলেছেন, আইনটি বাস্তবায়নে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশেষ করে খেলাপি সম্পদের সঠিক মূল্য নির্ধারণ, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়ন ও শক্তিশালী তদারকি। সেগুলো মোকাবিলা করতে পারলে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট থেকে বিপুল খেলাপি ঋণ দ্রুত অপসারণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি নতুনভাবে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি, অবলোপন করা ও নন-পারফর্মিং ঋণ পুনরুদ্ধার বা বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির জন্য কোনো সমন্বিত আইন নেই। ফলে ব্যাংকের ব্যালেন্স শিটে বিপুল পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ আটকে থাকছে, যা নতুন ঋণ বিতরণ ও আর্থিক খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। এ আইনটি কার্যকর হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে এসব সম্পদ বিক্রি, পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে গঠন হবে স্বায়ত্তশাসিত ইউনিট
জানা গেছে, ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট (ডিএএমইউ) প্রশাসনিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে থাকলেও আইন প্রয়োগে স্বায়ত্তশাসিত ক্ষমতা ভোগ করবে। এর প্রধানের পদমর্যাদা হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সমান। তাকে সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে ব্যাংকিং অর্থনীতি বা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হলে তিনি পদে থাকতে পারবেন না।
খেলাপি ঋণের জন্য আলাদা ট্রাস্ট
আইনে এক বা একাধিক ট্রাস্ট গঠন করতে হবে। ব্যাংক থেকে কোনো খেলাপি সম্পদ কিনলে সেটি কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ হবে না; বরং আলাদা ট্রাস্টের নামে রাখা হবে। ফলে ট্রাস্টে থাকা সম্পদ ডিএএমসির নিজস্ব সম্পদের অংশ হবে না। কোনো কারণে কোম্পানি দেউলিয়া হলেও ট্রাস্টে থাকা সম্পদের ওপর কোম্পানির পাওনাদাররা দাবি করতে পারবেন না।
পুনরুদ্ধারে টাস্কফোর্স
এই আইনে ডিস্টেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। খেলাপি সম্পদ শনাক্ত, তথ্য সংগ্রহ, সম্পদ উদ্ধার এবং আইনিব্যবস্থা সমন্বয়ের কাজ করবে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে বাধ্য করা হবে।
লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা নয়
ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি হিসেবে কাজ করতে চাইলে অবশ্যই ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের (ডিএমইউ) লাইসেন্স নিতে হবে। এ ছাড়া কোম্পানি আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত এবং নির্ধারিত পরিশোধিত মূলধন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, অভিজ্ঞ পরিচালনা পর্ষদ এবং ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। প্রতিটি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ২০ শতাংশ স্বাধীন পরিচালক রাখার বিধান থাকছে। তারা কোম্পানির মালিক বা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কোনো আর্থিক স্বার্থে জড়িত থাকতে পারবেন না।
আইন লঙ্ঘনে লাইসেন্স বাতিল
নিবন্ধিত ‘ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি’ (ডিএএমসি) কার্যক্রম পরিচালনার সময় অর্থ পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, প্রতারণা বা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তদন্তের পর তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। তবে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করার সুযোগও থাকবে।
তহবিল সংগ্রহের সুযোগ
এ কোম্পানি দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। যেমন— ঋণগ্রহণ; শেয়ার ও বন্ড ইস্যু; যৌথ বিনিয়োগ; সিকিউরিটাইজেশন; বিদেশি বিনিয়োগ। তবে কোনো ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানি থেকে সরাসরি ঋণ বা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, যাতে স্বার্থের সংঘাত না ঘটে।
থাকবে লোন সার্ভিসার কোম্পানি (এলএসসি)
খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার আরও পেশাদার করতে এলএসসি গঠনেরও বিধান রাখা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রহীতার সঙ্গে আলোচনা, পুনঃ তফসিল, সম্পদ অনুসন্ধান, তথ্য বিশ্লেষণ, আদালত-সংক্রান্ত সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ঋণ পুনরুদ্ধারে কাজ করবে। তবে তারা নিজ নামে মামলা, জনগণের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ এবং কোনো ধরনের জবরদস্তিমূলক বা বেআইনি উপায়ে ঋণ আদায় করতে পারবে না।





