গ্যাসসংকট বিদেশি ক্রেতাদের নজরে
- উৎপাদন পরিস্থিতি জানতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিনিধিরা নিয়মিত যোগাযোগ করছেন
- নতুন মৌসুমে ক্রয়াদেশের একটি অংশ প্রতিযোগী দেশগুলোয় চলে যাওয়ার ঝুঁকি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের গ্যাসসংকট এখন আর শুধু কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয় নয়; এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পোশাক রপ্তানির আন্তর্জাতিক বাজারেও। উৎপাদন পরিস্থিতি জানতে বিদেশি ক্রেতা ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিনিধিরা নিয়মিত যোগাযোগ করছেন কারখানা মালিকদের সঙ্গে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে ক্রেতাদের আস্থায় চিড় ধরতে পারে— এমন আশঙ্কায় উদ্যোক্তারা। এরই মধ্যে গ্যাসের অভাবে গাজীপুরসহ শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানা কয়েক দিন বন্ধ রাখার পর চালু হলেও অধিকাংশ কারখানা এখনো সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন করছে। ফলে নতুন মৌসুমের ক্রয়াদেশের একটি অংশ প্রতিযোগী দেশগুলোয় চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে গত কয়েক দিনে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় পরিস্থিতির তীব্রতা কমেছে। চার দিন বন্ধ থাকার পর অনেক কারখানা আবার উৎপাদনে ফিরেছে। যদিও সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে না আসায় অধিকাংশ কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও উদ্বেগ কাটেনি উদ্যোক্তাদের মধ্যে।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে স্প্রিং ও সামার মৌসুমের জন্য বিদেশি ক্রেতারা নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়া শুরু করেন। এ সময় গ্যাসসংকট অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। ফলে কিছু ক্রয়াদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোয় চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, গত কয়েক দিনে অন্তত ১১টি বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাকে ফোন করে দেশের গ্যাস পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘তাদের আশ্বস্ত করতে হচ্ছে যে, গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তীব্র সংকটও কিছুটা কমেছে। তবে এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।’
শোভন ইসলাম বলেছেন, গ্যাসসংকটের কারণে ছুটি সমন্বয় করতে গাজীপুরের প্রায় ৮০ শতাংশ কারখানা তিন থেকে চার দিন বন্ধ রাখা হয়েছিল। গতকাল শনিবার থেকে এসব কারখানা আবার চালু হয়েছে। তবে কারখানা চালু হলেও উৎপাদন বাড়েনি। অধিকাংশ কারখানা তাদের সক্ষমতার মাত্র ৩০-৪০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে।
গাজীপুরের মিতালি ফ্যাশনের মালিক তুহিন আব্দুল্লাহ জানিয়েছেন, তিন দিন বন্ধ রাখার পর গতকাল কারখানা চালু করেছেন তিনি। তার কারখানায় প্রতিদিন ১০ টনের বেশি কাপড় উৎপাদন হয়, সেখানে উৎপাদন হচ্ছে ৩ থেকে সাড়ে ৩ টন। তিনি বললেন, ‘গ্যাসের প্রেসারও অনেক কম। ফলে ৩০টি উৎপাদন লাইনের মধ্যে সাত থেকে আটটির বেশি চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।’
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেছেন, গ্যাসসংকট পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবে এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোও বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাচ্ছে। তারা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম দাম অফার করছে। ফলে উদ্যোক্তাদের এখন টিকে থাকার লড়াই করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেছেন, শুধু ইউরোপ নয়— নতুন বাজারগুলোতেও ক্রয়াদেশ কমছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী ডিসেম্বরের আগে পোশাক খাতের পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার রাত ৩টা ১০ মিনিট থেকে মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। বর্তমানে সেখান থেকে প্রায় ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। টার্মিনালের দ্বিতীয় বয়লার চালু হলে জাতীয় গ্রিডে আরও প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হতে পারে। বর্তমানে দৈনিক সরবরাহ প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুট হলেও চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হওয়ায় অধিকাংশ এলাকায় এখনো গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হয়নি। গ্যাসসংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে লোডশেডিং বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার এলএনজি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে এক কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে, যা ১১-১২ আগস্ট সরবরাহের কথা রয়েছে।




