বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
নিরাপদ পানিতে সরকারি ব্যয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে সরকারি ব্যয় এখনো প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র শূন্য দশমিক ২১৫ শতাংশ এবং মোট সরকারি ব্যয়ের প্রায় ১ দশমিক ৫৭ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়া পানি খাতে সবচেয়ে বড় ব্যয় ঘাটতির মুখে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
বিশ্বব্যাংকের ‘নিরাপদ পানি ভবিষ্যতের জন্য অর্থায়ন: বৈশ্বিক সরকারি ব্যয়ের মূল্যায়ন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। গতকাল মঙ্গলবার ওয়াশিংটন থেকে এটি প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের এ গবেষণায় প্রথমবারের মতো বিভিন্ন দেশের পানি খাতে সরকারি ব্যয়, অর্থায়নের ঘাটতি, বাজেট বাস্তবায়ন ও ব্যয়ের দক্ষতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পানি খাতে বছরে মোট ব্যয় প্রায় ১৬৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। অথচ নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে পানি ও স্যানিটেশন খাতে প্রতি বছর অতিরিক্ত ১৩১ দশমিক ৪ থেকে ১৪০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, পানি খাতের মাথাপিছু বার্ষিক ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩ দশমিক ৩২ ডলার। এর মধ্যে পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন খাতে ব্যয় প্রায় ৫০ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ২০৩ শতাংশ এবং মোট সরকারি ব্যয়ের ১ দশমিক ৪৮৬ শতাংশের সমান। মাথাপিছু এ খাতে ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ১৪ ডলার। বিশ্বব্যাংক বলছে, পানি খাতে অর্থের সংকটের পাশাপাশি বরাদ্দ করা অর্থ পুরোপুরি কাজে লাগাতে না পারাও বড় সমস্যা। বৈশ্বিকভাবে পানি খাতে সরকারি বাজেট বাস্তবায়নের গড় হার প্রায় ৭২ শতাংশ। ফলে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও বাড়াতে হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের উচিত দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিনিয়োগ করা, পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়ানো, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ পরিকল্পনা উন্নত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন আকৃষ্ট করা। একই সঙ্গে পানি খাতে তথ্যের স্বচ্ছতা, দক্ষ জনবল ও জবাবদিহি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দক্ষিণ এশিয়া পানি খাতে সবচেয়ে বড় ব্যয়ের ঘাটতির মুখে থাকা অঞ্চলগুলোর একটি। এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য পানি নিরাপত্তাকে শুধু জনস্বাস্থ্য বা পরিবেশগত বিষয় হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নগরায়ণ ও জলবায়ু সহনশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানি খাতে আরও বেশি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সেই অর্থ আরও দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করতে হবে। বাংলাদেশে পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামোর চাহিদা, নগরায়ণ এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি বাড়তে থাকায় এ বিনিয়োগের গুরুত্ব আরও বাড়ছে। বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পানি দূষণের কারণে পানি ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় নদী-খাল দূষণ এবং অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন পানি নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থার ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। বিশেষ করে মাসিকের সময় নিরাপদ ও উপযোগী টয়লেট সুবিধার অভাবে বাংলাদেশের কিশোরীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, এ কারণে কিশোরীরা তাদের প্রায় ২০ শতাংশ ক্লাস মিস করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি নিরাপত্তা এখন শুধু পানির প্রাপ্যতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, নগর ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সরাসরি যুক্ত। তাই পানি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।






