ভোট সামনে রেখে ব্যাংক লেনদেনে চাপ

সংগৃহীত ছবি
রাত পোহালেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট। নির্বাচন উপলক্ষে টানা চারদিনের ছুটি পেয়ে বাড়ি গেছেন রাজধানীবাসী। নিজ এলাকায় ভোট দেয়ার পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ফিরবেন তারা। যাতায়াত ও পরিবারের জন্য টুকটুাক উপহার বা প্রয়োজনীয় কেনাকাটা মিলিয়ে এই ভোটযাত্রায় বেড়েছে তাদের ব্যক্তিগত খরচ।
ভোট ঘিরে দেশজুড়ে খরচ বাড়ার সবচেয়ে বড় খাত হলো প্রার্থীদের প্রচার। কর্মী-সমর্থক-স্বজনরাও নিজ নিজ নেতার পক্ষে প্রচার চালাতে করেছেন ব্যাপক খরচাপাতি। এসব মিলিয়ে দেশে দুই মাস ধরে বেড়েছে নগদ টাকার চাহিদা।
বাংলাদেশে ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে,গত বছরের নভেম্বর মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৮ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বরে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা আরও বেড়ে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, অর্থাৎ দুই মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ বেড়েছে ৪০ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা।
নির্বাচন উপলক্ষে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ও বেড়েছে। এখন ব্যাংক ও এটিএম বুথ থেকে নগদ টাকা উত্তোলনের চাপ বাড়ছে। ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায়, বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হয়ে উঠেছে। এখন ব্যাংকের বাইরে রয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংকের বাইরে টাকা বেড়ে যাওয়াকে স্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুব রহমান। তিনি একটি গণমাধ্যমকে বলেন, অনেক দিন পর একটি ভোটারদের অধিকার আদায়ের আলোকে মতপ্রকাশের জন্য প্রকৃত নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
মানুষ ভোট দিতে শহরে ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছেন। প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরাও ভালো খরচ করেছেন। এ কারণে টাকা উত্তোলন কিছুটা বেড়েছে। এই টাকা আবার ব্যাংকে ফিরে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগেও অবশ্য ব্যাংক থেকে মানুষের হাতে নগদ টাকা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। কারণ, তখন কয়েকটি ব্যাংক থেকে ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে টাকা বের করে নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ এস আলম গ্রুপ।
সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে এই গ্রুপের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে দেয়। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে। সরকার বদলের পর মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তাতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে এবং এরপর ব্যাংকগুলোতে টাকা ফিরতে শুরু করে।
তবে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগে আবার ব্যাংকের বাইরে টাকা বাড়ে। কোনো কোনো মাসে অবশ্য কমেও। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ টাকা কমেছে। জুলাইয়ে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা, যা কমে আগস্টে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বরে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা ও অক্টোবরে ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকায় নামে।
পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এই নগদ লেনদেন প্রতিবেদন সাপ্তাহিক ভিত্তিতে জমা দিতে হবে। প্রতি সপ্তাহের রিপোর্ট পরবর্তী সপ্তাহের তিন কার্যদিবসের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে সিটিআর দাখিলে ব্যর্থতা কিংবা ভুল, অসম্পূর্ণ বা মিথ্যা তথ্য দিলে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।
এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা (এমএফএস) সীমিত করা হয়েছে। ফলে বিকাশ, রকেট, নগদসহ মোবাইল ব্যাংকিং সেবার গ্রাহকেরা দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেন করতে পারছেন। প্রতিটি লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা এক হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংকিং চ্যানেলে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহার করে এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির হিসাবে টাকা স্থানান্তর সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে, যা ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। নির্বাচন কমিশনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিএফআইইউ টাকা দিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার প্রবণতা ঠেকাতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) অরূপ হায়দার জানান, তাঁদের ব্যাংকে জানুয়ারি মাসের তুলনায় চলতি মাসে টাকা তোলা বেড়েছে ১৯ শতাংশ।
ব্যাংক বন্ধ থাকবে ও নির্বাচনের কারণে টাকা উত্তোলন বেশি বেড়েছে। এদিকে গত ১১ জানুয়ারি থেকে নগদ অর্থ জমা বা উত্তোলনে তদারকি জোরদার করেছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। সংস্থাটির নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো একটি হিসাবে কোনো নির্দিষ্ট দিনে এক বা একাধিক লেনদেনের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা বা তদূর্ধ্ব অর্থ কিংবা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা জমা বা উত্তোলনের ক্ষেত্রে (অনলাইন, এটিএমসহ যেকোনো ধরনের নগদ লেনদেন) বিএফআইইউর কাছে নগদ লেনদেনের প্রতিবেদন (সিটিআর) জমা দিতে হবে।

