মাদকের থাবা গড়াচ্ছে র্যাব খুন পর্যন্ত!

সিলেটে নিয়মিত চলে মাদকবিরোধী অভিযান। গ্রেপ্তারও হন অনেক কারবারি ও মাদকসেবী। এরপরও নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না নেশাজাতীয় দ্রব্যের বিস্তার, মিলছে হাত বাড়ালেই। আগে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে পাওয়া গেলেও এখন ছড়িয়ে পড়েছে পুরো নগরে। এতেই চড়ছে অপরাধের পারদ।
নেশার টাকা জোগাড় করতে চুরি-ছিনতাই এখন নিত্যব্যাপার। অপরাধের তালিকায় এবার যুক্ত হলো খুন।
গত ২২ মে নগরীর ক্বিনব্রিজ এলাকায় মাদকসেবীদের ধরতে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান র্যাব সদস্য ইমন আচার্য্য। এরপরও কি ধরা যাবে মাদকের লাগাম? সম্ভবত না, অনেক জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতার প্রশ্রয়ে এসব কারবার চলায় তা বন্ধ করা দুষ্কর বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
একসময় নেশাজাতীয় দ্রব্যের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত ছিল নগরীর কাস্টঘর এলাকার সুইপার কলোনি, ক্বিনব্রিজ এলাকা এবং শহরতলির নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্ট। এখন পুরো শহরেই চলে মাদক কারবার। অবাধে চোরাচালান ও ছড়িয়ে পড়ছে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন অখাদ্য। তথ্যটি অস্বীকার করতে পারলেন না জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অফিসের উপপরিচালক বিপ্লব কুমার মোদক। “এখন আর কোনো স্পট নির্দিষ্ট নেই। মাদকের ভ্রাম্যমাণ কারবার চলছে। সবচেয়ে ‘অ্যালার্মিং’ বিষয় হলো— ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে আসক্তি বাড়ছে বেশি,” যোগ করলেন তিনি।
শুধু নগর নয়, জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জ ও পাড়া-মহল্লায়ও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে মাদক বেচাকেনা। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে ফেনসিডিল, কোকেন, ড্যান্ডি, গাঁজাসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য। এমনকি ১০ বছরের শিশুদের ওপরও ভর করেছে ‘ড্যান্ডি’ সেবনের প্রবণতা। মাঝেমধ্যে দু-একটি অভিযানে হাতেনাতে ধরাও পড়ছেন কারবারিরা।
আগে সিলেট মূলত গাঁজা ও ফেনসিডিলের রুট ছিল। এখন ইয়াবাও সহজলভ্য। সীমান্তের ছোট ছোট পয়েন্ট, নদীপথ ও পাহাড়ি রাস্তা ব্যবহার করে রাতের আঁধারে ঢুকছে মাদকের চালান। পরে তা নগরকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে— বর্ণনা দিলেন গোয়েন্দা সংস্থার কয়েক কর্মকর্তা।
চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) জাতীয় গবেষণার ফলাফলে জানানো হয়, সিলেটে বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবহার করে এমন মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। এ ছাড়া বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভারতের মিজোরাম রাজ্য থেকে আসাম ও মেঘালয় হয়ে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ঢুকছে সিলেটে। জকিগঞ্জ ও বাল্লা সীমান্তের ওপারে ভারতের অংশে গড়ে উঠেছে ইয়াবা তৈরির ছোট ছোট কারখানা।
জকিগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৫৪ কিলোমিটার সীমান্তপথ ব্যবহার করে করিমগঞ্জ ও শিলচর এলাকা হয়ে পাচার হয় ইয়াবা। ভারতের করিমগঞ্জের আবদুল্লাহপুর এলাকায় ইয়াবা তৈরির কারখানাও রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিজিবি ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র।
সিলেটে মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রক হিসেবে উঠে এসেছে কয়েক জনপ্রতিনিধির নাম। একাধিক সূত্র জানায়, জকিগঞ্জ উপজেলার খলাছড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহীন আহমদ এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য শাহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে রয়েছে পৃথক ইয়াবা পাচারের মামলা। তাদের মতো রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি এই কারবারে জড়িয়ে পড়ায় আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে চোরাচালান নেটওয়ার্ক।
তবে শাহীন ও শাহাব জামিনে আছেন বলে জানিয়েছেন জকিগঞ্জ থানার এসআই মাসুদ আহমদ।
জনপ্রতিনিধি হয়েও কীভাবে মাদক চোরাচালান করেন, সে বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শাহীন ও শাহাবের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তারা রিসিভ করেননি। এমনকি তাদের বাড়িতে গিয়েও পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবা আসক্তির কারণে তরুণদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা, সহিংস আচরণ, ঘুমের সমস্যা ও হতাশা বাড়ছে। পারিবারিক সহিংসতা, চুরি, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং বিস্তারের পেছনেও এর প্রভাব।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। সীমান্তে কঠোর নজরদারি, তরুণদের কর্মসংস্থান, পরিবারভিত্তিক সচেতনতা এবং কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।
নিয়মিত অভিযান এবং গ্রেপ্তারের পরও মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কেন— জানতে চাইলে সিলেট জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অফিসের উপপরিচালক বিপ্লব কুমার মোদক আগামীর সময়কে বললেন, “মাদক কারবারিরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল পাল্টাচ্ছেন। আমরা নতুন কৌশল অবলম্বন করছি। কিন্তু তারপরও নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। তবে এজন্য ‘সমন্বিত প্ল্যান’ দরকার।”






