পর্যটনে সম্ভাবনাময় মৌলভীবাজার, তবু পিছিয়ে

পাহাড়-টিলা, ঝরনা, হাওর-বাঁওড়, চা বাগান আর বনাঞ্চলে সমৃদ্ধ মৌলভীবাজার। এর সঙ্গে রয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপনা, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ও নান্দনিক জলাভূমি। এসব কারণে দেশের অন্যতম পর্যটনসমৃদ্ধ জেলা হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজার। লাউয়াছড়া, মাধবকুণ্ড, হামহাম, মাধবপুর লেক ও বাইক্কা বিলসহ শতাধিক পর্যটনকেন্দ্রে সারা বছরই ভিড় করেন দেশি-বিদেশি পর্যটক। তাদের চাহিদা ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রায় ২০০ কটেজ ও রিসোর্ট। তবু যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব এবং নতুন পর্যটন আকর্ষণ তৈরিতে সরকারি উদ্যোগের ঘাটতিতে সম্ভাবনার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে জেলার পর্যটন খাত।
কারণ হিসেবে পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতির কথা। তাদের দাবি, ২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যটন জেলা ঘোষণা করা হয়। এরপর কেটে গেছে প্রায় দেড় যুগ। কিন্তু এ সময়ে পর্যটন খাতে বড় কোনো দৃশ্যমান সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা নিজেদের উদ্যোগে রিসোর্ট, কটেজ ও অন্যান্য পর্যটনসেবা গড়ে তুললেও জেলার সামগ্রিক পর্যটন অবকাঠামো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
অবকাঠামোর এ ঘাটতি সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয় যোগাযোগব্যবস্থায়। পর্যটন কেন্দ্রগুলোয় যাতায়াতের ক্ষেত্রে সড়ক যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি ট্রেনের টিকিট সংকটও পর্যটকদের ভোগান্তি বাড়ায়। বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের উপযোগী তথ্য, পরিবহন, থাকার ব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক আকর্ষণ থাকলেও পর্যটকের অভিজ্ঞতাকে পূর্ণাঙ্গ করার মতো সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
অথচ পর্যটন আকর্ষণের দিক থেকে মৌলভীবাজারের বৈচিত্র্য উল্লেখ করার মতো। জেলার সাতটি উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, মাধবকুণ্ড ও হামহাম জলপ্রপাত, বাইক্কা বিল, মাধবপুর লেক এবং হাকালুকি হাওর এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এর বাইরে আঁকাবাঁকা টিলা জুড়ে বিস্তৃত ৯২টি চা বাগান, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, মণিপুরী পল্লী, খাসিয়া পুঞ্জি, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, নীলকণ্ঠ টি কেবিন, সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা, পৃথিমপাশা নবাববাড়ি ও পাথারিয়া হিলস রিজার্ভ ফরেস্টও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এ বৈচিত্র্যের সঙ্গে গত এক দশকে যুক্ত হয়েছে আধুনিক পর্যটনসেবাও। ২০১৫ সালে শ্রীমঙ্গলে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ চালুর পর জেলার পর্যটন খাতে আধুনিক রিসোর্ট ব্যবসার বিস্তার ঘটে। এরপর বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক কটেজ ও রিসোর্ট গড়ে ওঠে। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২০০।
পর্যটনসেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমনের ভাষ্য, ‘একই পর্যটনকেন্দ্র বারবার দেখতে পর্যটকরা আগ্রহী হন না; তারা নতুনত্ব চান। মৌলভীবাজারে পর্যটকদের সেই চাহিদার যথেষ্ট প্রতিফলন নেই। নতুন বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা হলেও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।’
পর্যটনসেবা সংস্থার সভাপতি ও গ্র্যান্ড সেলিম রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী সেলিম আহমদ বলেছেন, ‘রিসোর্ট ব্যবসা বাড়লেও যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিদেশি পর্যটকদের চাহিদা পূরণের মতো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাও এখনো পর্যাপ্ত নয়।’
পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগের কথাও বলা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বললেন, ‘জেলার পর্যটন খাতকে গতিশীল করতে সরকারের কাছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’ তার আশা, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পর্যটন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।



