শিক্ষকদের ক্লাসে আনতে শাস্তি-কড়াকড়ি কিছুই আসছে না কাজে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সিলেটের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। অথচ তাদের পাঠদান চলছে মাত্র চারজন শিক্ষক দিয়ে। এরই মধ্যে আবার একজন শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। অভিযোগ রয়েছে, ছুটি না নিয়েই তিনি প্রায় ১৫ মাস দেশের বাইরে অবস্থান করেছেন। সরকারি টিচার অ্যাপসেও এখনো তাকে স্বপদে কর্মরত দেখানো হচ্ছে।
বিয়ানীবাজার উপজেলার লাসাইতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই চিত্রটি যেন সিলেটের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার বড় এক সংকটের প্রতিচ্ছবি। একদিকে বছরের পর বছর ধরে শূন্য পড়ে আছে শত শত শিক্ষক পদ, অন্যদিকে কর্মরতদের কেউ কেউ দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় চাপ বাড়ছে অন্য শিক্ষকদের ওপর। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার্থীদের পাঠদানে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে ১৬৩ শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। অধিকাংশ মামলায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। আরও ৪৮টি বিভাগীয় মামলা চলমান।
শুধু দীর্ঘ অনুপস্থিতির ঘটনাই নয়, শিক্ষক সংকটও সিলেটের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্য বড় বাস্তবতা। জেলার ১ হাজার ৪৭৭টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ৭৮৮টি এবং সহকারী শিক্ষকের ৬৮৩টি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে কোনো বিদ্যালয়ে কর্মরত একজন শিক্ষকও দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে দীর্ঘ অনুপস্থিতির অভিযোগে সবচেয়ে বেশি বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বিশ্বনাথে ২৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে। বিয়ানীবাজার ও ওসমানীনগরে ২০ জন করে, দক্ষিণ সুরমায় ১৮, সিলেট সদর ও জকিগঞ্জে ১৬ জন করে, গোলাপগঞ্জে ১২, বালাগঞ্জে ১১, গোয়াইনঘাটে ১০, কানাইঘাটে ৭, ফেঞ্চুগঞ্জ ও জৈন্তাপুরে ৪ জন করে এবং কোম্পানীগঞ্জে ১ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে দপ্তরের নথিতে থাকা এই পরিসংখ্যানের বাইরেও মাঠপর্যায়ে দীর্ঘ অনুপস্থিতির অভিযোগ রয়েছে। এর একটি উদাহরণ লাসাইতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ইমরানা খানমকে ঘিরে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৭ সালে বিদ্যালয়টিতে যোগ দেওয়ার পর একপর্যায়ে প্রায় ১৫ মাস ছুটি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন তিনি। একই সময়ে তার বিদেশে অবস্থানের অভিযোগও রয়েছে। এমনকি বিদেশে থাকা অবস্থায় তিনি সরকারি চাকরির বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন— এমন অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান চলছে মাত্র চারজন শিক্ষক দিয়ে। শিক্ষক সংকটের মধ্যে একজন শিক্ষক দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ছে।
তবে ওই শিক্ষকের দীর্ঘ অনুপস্থিতির বিষয়টি সরাসরি জানা নেই বলে জানিয়েছেন বিয়ানীবাজারের উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পারভেজ তালুকদার। তিনি শিক্ষা অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের সুযোগ থাকার কথা স্বীকার করে এর পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন।
অন্যদিকে, কীভাবে একজন শিক্ষক এত দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি— এ প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বিয়ানীবাজারের উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নৃপেন্দ্র নাথ সরকার।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়েও এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। লাসাইতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক প্রায় ১৫ মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগের বিষয়ে সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে তিনি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযোগটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধও করেন তিনি। এদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের নথি বলছে, দীর্ঘ অনুপস্থিতির অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। ২১ মাসে ১৬৩ শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং ১৪০টি মামলা নিষ্পত্তির তথ্যই তার প্রমাণ।
শিক্ষক সংকট ও দীর্ঘ অনুপস্থিতির এই বাস্তবতায় উদ্বিগ্ন অভিভাবকরাও। তাদের অভিযোগ, একজন শিক্ষক দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ে না থাকলে সেই ঘাটতি পূরণ করতে অন্য শিক্ষকদের বাড়তি দায়িত্ব নিতে হয়। এতে ব্যাহত হয় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান।
এদিকে নতুন শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চললেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে ৪৬৪ জনের কাগজপত্র জমা হয়েছে। অথচ জেলায় সহকারী শিক্ষকেরই শূন্য পদ রয়েছে ৬৮৩টি।
বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ উম্মে হাবিবা মজুমদার জানিয়েছেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দীর্ঘ অনুপস্থিতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ ওঠা শিক্ষকদের বেতন আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদও বলেছেন, অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় দালিলিক প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



