নরসিংদীতে থামছেই না খুনোখুনি

নরসিংদীতে থামছে না খুনোখুনি। হত্যার শিকার হয়েছেন সংসদ সদস্য, পৌর মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, কলেজছাত্র সংসদের জিএসসহ অনেক রাজনৈতিক নেতা। পাঁচ দশকের ব্যবধানে ঘটা এসব খুনের নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারের জের। পাশাপাশি রয়েছে জমি নিয়ে বিরোধ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, পারিবারিক কলহসহ নানা তুচ্ছ কারণও। পুলিশের হিসাব, গত ২০ বছরে জেলায় খুন হয়েছে দেড় হাজারের বেশি মানুষ। আর গত ২০ মাসে খুনের শিকার হয়েছেন ১৫৮ জন।
স্বাধীনতার পর সবচেয়ে আলোচিত ছিল মনোহরদী-বেলাবর তৎকালীন সংসদ সদস্য গাজী ফজলুর রহমানের হত্যার ঘটনা। ১৯৭৪ সালে তাকে গুলি করে হত্যা করে সর্বহারা পার্টির লোকেরা। এরপর ১৯৮৬ সালে খুন হন শিবপুরের খান পরিবারের সাবেক সংসদ সদস্য রবিউল আউয়াল খান। তিনি ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বিরোধ ও স্থানীয় কোন্দলের কারণেও প্রাণ গেছে অনেকের। ১৯৭২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পাঁচদোনা এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় সিরাজউদ্দিন আহমেদকে (নেভাল সিরাজ)। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি পেয়েছিলেন ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব।
স্বাধীনতার পর খুন হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন দুজন সংসদ সদস্য, একজন উপজেলা চেয়ারম্যান, একজন পৌর মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ১৫ জন চেয়ারম্যান। এ ছাড়া খুন হয়েছেন ইউপি সদস্য, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, শ্রমিক নেতা, ব্যবসায়ী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। শুধু আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে জেলায় খুন হয়েছেন পাঁচজন সাবেক ও তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান, একজন উপজেলা চেয়ারম্যান এবং একজন পৌর মেয়র। তারা সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন।
হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারসহ সব ধরনের অপরাধ নির্মূলে কাজ করছে পুলিশ -সুজন চন্দ্র সরকার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, নরসিংদী
এ ছাড়া রয়েছে আরও আলোচিত হত্যার ঘটনা। ১৯৯৫ সালে নরসিংদী সদরের তৎকালীন বিএনপির সংসদ সদস্য সামশুদ্দিন আহমেদ এছহাকের ছেলে মাসুদ আহমেদ হত্যা, ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি নরসিংদী পৌর কাউন্সিলর মানিক মিয়াকে গুলি করে হত্যা। মানিক হত্যার প্রধান আসামি ছিলেন জেলা ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন। পরে নরসিংদী পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। ২০১১ সালের নভেম্বরে খুন হন আলোচিত এ পৌর মেয়র। এ খুনের বিচার শেষ হয়নি এখনো। ২০২৩ সালের ৩১ মে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ৯৪ দিন পর মারা যান শিবপুরের উপজেলা চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ খান। ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিলে খুন হন সদর উপজেলার আলোকবালী ইউনিয়ন পরিষদের ছয়বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক সরকার। ২০২৪ সালের ২৮ মে নরসিংদী সদর উপজেলার মেহেরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল হাসানকে (৪০) কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। সবশেষ ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মাধবদীতে পিটিয়ে হত্যা করা হয় চরদিঘলদীর ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন শাহীনসহ ছয়জনকে। দীর্ঘদিন আদালতের বারান্দায় ঘুরে বিচার না পেয়ে হতাশ অনেক পরিবার।
নিহত মেহেরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাহাবুবুল হাসানের ছোট ভাই হাফিজুল হাসান বললেন, ‘বিচারের আশায় কোর্টের বারান্দায় ঘুরছি। সব আসামি জামিনে বের হয়ে হুমকি দিচ্ছে। সাক্ষীরাও দেশের বাইরে পালিয়ে যাচ্ছেন ভয়ে। আইনজীবীরা বলছেন, আসামিদের জামিনের অধিকার রয়েছে। কীভাবে বিচার পাব?’
এদিকে ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী গত ২০ মাসে জেলায় ঘটেছে ১৫৮টি খুনের ঘটনা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে খুন হন ৬, আগস্টে ২৩, সেপ্টেম্বরে ১২, অক্টোবরে ১২, নভেম্বরে ৬, ডিসেম্বরে ৭ জন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে খুন হন ১০, ফেব্রুয়ারিতে ৪, মার্চে ৯, এপ্রিলে ১০, মে’তে ১২, জুনে ৫, জুলাইয়ে ৩, আগস্টে ৩, সেপ্টেম্বরে ৮, নভেম্বরে ৩, ডিসেম্বরে ৭ জন। চলতি বছর জানুয়ারিতে ৭, ফেব্রুয়ারিতে ৭ ও মার্চে ৪ জন খুন হন। এসব খুনের ঘটনায় হত্যা মামলা হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে অধিকাংশ আসামি। কেউবা রয়েছেন জামিনে। গত ২০ বছরে জেলায় খুন হয়েছে দেড় হাজারের বেশি মানুষ।
বিশ্লেষকদের তথ্য, একসময় শুধু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হলেও যুগে যুগে পাল্টেছে হত্যার কারণ এবং ধরন। ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে অস্ত্র, মাদক, জমির বিরোধ, ইন্টারনেট-ডিশ বা বালু ব্যবসাসহ নানা তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করেই ঘটছে এসব হত্যা।
পারিবারিক কলহের জেরেও হত্যার শিকার হচ্ছে বলে দাবি ভুক্তভোগী পরিবার, প্রশাসন, রাজনীতিক, নাগরিক সমাজ, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। পাশাপাশি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তাকেও দায়ী করছেন অনেকে।
নরসিংদী ইনডিপেনডেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ ড. মশিউর রহমান মৃধা মনে করেন, ‘বিচারহীনতার কারণে জেলায় হত্যাকাণ্ড থামছে না। অপরাধীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ায় সে আরেকটা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নরসিংদী জেলার সাধারণ সম্পাদক হলধর দাসের ভাষ্য, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হত্যাকাণ্ড আরও বেড়েছে। পুলিশ নিজেই এখন দুর্বল। তাই আইনশৃঙ্খলা ভালো নেই।’ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আইনজীবী আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া জানালেন, বিভিন্ন জটিলতায় শেষ হচ্ছে না বিচারিক প্রক্রিয়া। বিচারসম্পন্ন হলে অপরাধের মাত্রা কমে আসবে।
নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সুজন চন্দ্র সরকার বললেন, ‘পেশাগত দিক বিবেচনায় নিয়ে হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারসহ সব ধরনের অপরাধ নির্মূলে কাজ করছে পুলিশ।’ দ্রুত সময়ের মধ্যে জেলায় হত্যার মতো অপরাধ নির্মূলে আশাবাদী এ পুলিশ কর্মকর্তা।




