ইতালি পাঠাতে প্রতারণা, এক পরিবারের ১২ জনের নামে মামলার আবেদন

ইতালি পাঠানোর আশ্বাসে প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিযোগকারী মামুন খন্দকার। ছবি: আগামীর সময়
‘আর কিছুদিন অপেক্ষা করুন, ইতালির ভিসা হয়ে যাবে’- এই আশ্বাস বারবার শুনছিলেন মাদারীপুর সদরের দত্তকেন্দুয়া ইউনিয়নের পূর্ব শ্রীনাথদী গ্রামের মামুন খন্দকার। একমাত্র ছেলেকে ইউরোপের দেশ ইতালিতে পাঠিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলাতে চেয়েছিলেন তিনি। সব সঞ্চয় ভেঙে, ধারদেনা ও ব্যাংক লোন মিলিয়ে জোগার করেন ৪৫ লাখ টাকা। তুলে দেন স্থানীয় দালালের হাতে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হাতে আসে ভিসা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। তবে ইতালির দূতাবাসে নেওয়ার পর জানা যায়- এসব জাল কাগজ। এসব অভিযোগে স্থানীয় ওই দালালের পরিবারের ১২ জনকে আসামি করে মাদারীপুরের আদালতে প্রতারণার মামলার আবেদন করেছেন মামুন খন্দকার।
তবে গত ২৬ জুলাই করা আবেদনের শুনানি হয়নি এখনও। এরপর স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযোগ জানান মামুন। অভিযুক্তরা হলেন, পূর্ব শ্রীনাথদী গ্রামের কাবিল ফকির, মজিবর ফকির, হাবিবুর রহমান ফকির, রহমান ফকিরসহ পরিবারটির ১২ সদস্য এবং আরও কয়েকজন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে জনশক্তি পাঠানোর সঙ্গে জড়িত বলে এলাকায় পরিচিত। ছেলে মইন খন্দকারকে ইতালি পাঠাতে কাবিল ফকির ও তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন মামুন।
২০২২ সালের ৫ আগস্ট থেকে ধাপে ধাপে তাদের হাতে তুলে দেন টাকা। এর মধ্যে ২৫ লাখ টাকা দেন নগদে, বাকি টাকা দেওয়া হয় কাবিল ফকিরের স্ত্রী তানিয়া আক্তারীর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে। ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট ঢাকায় ইতালীয় দূতাবাসে গিয়ে মামুন জানতে পারেন, তাকে দেওয়া ভিসা ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের কোনো সত্যতা নেই। পরে আরও নানা আশ্বাস পেয়ে একই চক্রকে সে বছরের সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, পরের বছরের জানুয়ারি ও আগস্টে ৯ লাখ টাকা দেন মামুন। সব মিলিয়ে মোট ৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে- দাবি বাদীর।
স্থানীয় আরও কয়েকজন ওই চক্রটির প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল করিম বললেন, ‘বিদেশে পাঠানোর নামে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ বহুদিনের। প্রতিবাদ করলে হুমকিরও অভিযোগ রয়েছে। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’
এ বিষয় নিয়ে একাধিকবার গ্রামে সালিশ হলেও কোনো সমাধান মেলেনি বলে জানালেন স্থানীয় বোরহান সিকদার। মাকসুদা খন্দকারের অভিযোগ, ‘আমার ভাইয়ের ছেলে মঈন ভালো ছাত্র ছিল। বিদেশে নেওয়ার লোভ দেখিয়ে তার পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিদেশেও যেতে পারেনি, উল্টো আমাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।’
আদালতে আবেদনকারী মামুন বললেন, ‘ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে জীবনের সব সঞ্চয়, ধারদেনা করে ৪৫ লাখ টাকা দিয়েছি। পরে বুঝতে পারি আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি। আমার ছেলে পড়াশোনা থেকেও পিছিয়ে পড়েছে। আমি আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার চাই।’
এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত হাবিবুর রহমান ফকির ও রহমান ফকির। ‘আমরা কাউকে বিদেশে পাঠাইনি। বিদেশে নেওয়ার বিষয়েও আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কেন আমাদের নামে মামলা হয়েছে, তা আমরা জানি না’- দাবি তার।
অভিযুক্ত কাবিলের স্ত্রী তানিয়া আক্তারীর ভাষ্য, ‘আমার স্বামী ২০২৩ সালের আগে ইতালিতে কিছু লোক পাঠিয়েছেন। পরে স্পন্সর ভিসা নিয়ে কিছু জটিলতা তৈরি হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে আমরা কাউকে বিদেশে পাঠাই না।’
অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব। জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বললেন, ‘আদালতের নির্দেশনা বা তদন্তের দায়িত্ব পেলে অভিযোগের প্রতিটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হবে। প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মাদারীপুর আদালতের আইনজীবী আবুল হাসান সোহেল মনে করেন, ‘বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির বাইরে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের আগে সরকারি অনুমোদন, ভিসা ও অন্যান্য কাগজপত্র অবশ্যই যাচাই করা উচিত।’









