সম্পাদকীয়
দৌড়ে ধরতে হবে পাচারের টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ কোনো দেশের কাছে পাচার হওয়া অর্থের তথ্য চাওয়ামাত্রই অপরাধীরা সতর্ক হয়ে যাচ্ছে। তারা দ্রুত সেই অর্থ অন্য দেশে সরিয়ে ফেলছে। পাচারের টাকা ফেরাতে হলে টাকার এই অন্য দেশে চলে যাওয়া সবার আগে ঠেকাতে হবে। সহজ কথায়, পাচারকারীদের চেয়ে দ্রুতগামী হতে হবে, টাকা অন্য দেশে গমনের আগেই তাকে আটকাতে হবে। কিন্তু তা না হওয়ায় তদন্তের সূত্র ভেঙে যাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এই জটিলতার কারণে অর্থ ফেরানোর পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। আমদানি ও রপ্তানিতে পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে মূলত এই অর্থ সরানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ গেছে। এই বিপুল পরিমাণ পুঁজি এভাবে বাইরে চলে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। বর্তমান সংকটের সময়ে এই অর্থ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি; কিন্তু প্রচলিত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ধীরগতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
বর্তমানে কোনো দেশের কাছে তথ্য চাইতে হলে আবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যায়। এরপর দূতাবাসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। এই দীর্ঘ ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। বাংলাদেশ যখন প্রথম ধাপের তথ্য হাতে পায়, ততক্ষণে টাকা তৃতীয় কোনো দেশে চলে যায়। এই বাধা দূর করতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত যোগাযোগের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে গন্তব্য দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরাসরি যোগাযোগের যে প্রস্তাব এসেছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার।
আশার কথা হলো, অর্থ পাচার প্রতিরোধে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ডের মতো দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। ১০টি দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে তিন দেশ এরই মধ্যে সম্মতি দিয়েছে। তবে শুধু চুক্তি বা আগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই সহযোগিতা কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে, সেটাই আসল বিষয়।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ এখনো ‘কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড’ বা সিআরএসে যুক্ত হতে পারেনি। এ ব্যবস্থায় থাকলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আর্থিক তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনিময় করা সম্ভব হতো। আর্থিক খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ না হওয়ায় বাংলাদেশ এ সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। তাই অর্থ পাচার ঠেকাতে এবং পাচার করা টাকা উদ্ধার করতে হলে অভ্যন্তরীণ আর্থিক খাতের সংস্কার সবার আগে প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে নিজেদের আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। সরকারের সদিচ্ছার পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি না পেলে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়া কঠিন হবে।




