ইতালির স্বপ্ন লিবিয়ায় জিম্মি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পূর্ব টুবিয়া গ্রামের সরু রাস্তা ধরে হাঁটলে বারবার চোখে পড়ে একই দৃশ্য। উঠানে বসে থাকা বৃদ্ধ মা, দরজার পাশে নির্বাক বোন, আর প্রতিটি মোবাইল ফোনের রিংটোনে চমকে ওঠা স্বজনরা। কারও অপেক্ষা ছেলের জন্য, কারও ভাইয়ের জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষা দিন পেরিয়ে মাস, মাস পেরিয়ে বছরের কাছাকাছি হলেও হচ্ছে না শেষ। একসময় যাদের ঘরে বিদেশযাত্রার স্বপ্ন ছিল, আজ সেখানে শুধুই কান্না, ঋণের বোঝা আর অনিশ্চয়তার অন্ধকার।
অভিযোগ উঠেছে, ইতালিতে বৈধভাবে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মাদারীপুর সদর উপজেলার ঝাউদী ইউনিয়নের পূর্ব টুবিয়া গ্রামের বহু যুবককে লিবিয়ায় নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে মানব পাচারকারী চক্রের কাছে। এরপর তাদের ওপর চালানো হয়েছে নির্যাতন। সেই ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে আদায় করা হয়েছে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ। কিন্তু টাকা দেওয়ার পরও অনেকের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, স্থানীয় কয়েকজন দালালের মাধ্যমে প্রথমে পাঠানো হয় কুনিয়া ইউনিয়নের আদিত সুমন ব্যাপারীর কাছে। পরে তাদের ইতালির বদলে লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করা হয়।
২০২৫ সালের মার্চে ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছাড়েন রাহাত তালুকদার। পরিবারের দাবি, স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ২২ লাখ টাকা দিয়ে তাকে পাঠানো হয়। কয়েক দিন পরই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। ইতালি নয়, রাহাত তখন লিবিয়ার একটি নির্যাতনকেন্দ্রে। মুখে কাপড় ও হাত-পা বেঁধে মারধরের ভিডিও পাঠানো হয় পরিবারের কাছে। বলা হয়, আরও ২৫ লাখ টাকা না দিলে হত্যা করা হবে তাকে।
রাহাতের মা মায়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘ভিডিওতে ছেলের চিৎকার শুনে মনে হয়েছে আমি তখনই মারা গেছি। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য যা ছিল বিক্রি করেছি সব। আত্মীয়দের কাছ থেকে করেছি ধার। তারপরও ছেলের কোনো খবর নেই। সে বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে, জানি না। প্রতিদিন আল্লাহর কাছে শুধু দোয়া করি, একবার আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দাও।’
‘দালালরা প্রথমে স্বপ্ন দেখিয়েছে, পরে সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। টাকা নেওয়ার পর তারা ফোন ধরা বন্ধ করে দেয়’— বললেন রাহাতের দুলাভাই জামাল মাতুব্বর।
একই গ্রামের মস্তফা হাওলাদারের ঘটনাও একই রকম। ইতালি পাঠানোর আশ্বাসে দেশছাড়ার পর পরিবারের কাছে আসে নির্যাতনের ভিডিও। ছেলেকে জীবিত ফেরানোর আশায় প্রায় ৫০ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয় দালালদের হাতে। কিন্তু তারপরও মস্তফার কোনো সন্ধান মেলেনি।
তার মা বিলকিস আরা বেগমের ভাষ্য, ‘বিক্রি করেছি ভিটেমাটি, গরুও বিক্রি করেছি, মানুষের কাছে হাত পেতেছি। কিন্তু আমার ছেলে আর ফেরেনি। একজন মায়ের জীবনে এর চেয়ে বড় কষ্ট নেই।’
তার আকুতি, ‘প্রতিটি রাত আমার কাছে দুঃস্বপ্নের মতো কাটে। আমি শুধু আমার সন্তানকে একবার দেখতে চাই। যারা আমাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে, তাদের কঠোর শাস্তি চাই।’
আরাফাত কাজীকেও একইভাবে ইতালির স্বপ্ন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। তার বড় ভাই মাহাবুব কাজী বললেন, ‘৫৩ লাখ টাকা দেওয়ার পরও খবর পাইনি ভাইয়ের। প্রতিদিন মনে হয় আজ হয়তো ফোন আসবে। কিন্তু সেই ফোন আর আসে না। সেই অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। উদ্বেগ, আতঙ্কও কাটছে না।’
শুধু রাহাত, মস্তফা কিংবা আরাফাত নন, পূর্ব টুবিয়া গ্রামের অর্ধশতাধিক যুবক একই কৌশলে হয়েছেন প্রতারণার শিকার। অনেক পরিবার মুক্তিপণ দিতে গিয়ে জমি বিক্রি করেছে, গয়না বিক্রি করেছে, ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়েছে। তবুও তাদের সন্তানরা ফেরেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা জুবায়ের তালুকদার, মহাসিন তালুকদার ও সিয়াম তালুকদারের ভাষ্য, দালালরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলতেন, কয়েক মাসের মধ্যেই ইতালিতে ভালো চাকরি হবে। সেই কথায় বিশ্বাস করে মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছে। এখন গ্রাম জুড়ে শুধু কান্না।
অবশ্য ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করার কথা বলছেন মাদারীপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা। পাশাপাশি নিখোঁজদের উদ্ধারের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।





