সিলেট-আখাউড়া রেলপথ
রেলের চাকা ঘোরে, বাড়ে অনিশ্চয়তা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একের পর এক লাইনচ্যুতি, ইঞ্জিন বিকল, তেলবাহী ট্রেন দুর্ঘটনা, সময়সূচির বিপর্যয়— সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিলেট-আখাউড়া রেলপথ এখন পরিণত হয়েছে অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির প্রতীকে। গত আট বছরে এই রুটে ঘটেছে অন্তত ১৬টি ছোট-বড় দুর্ঘটনা। চলতি বছরেও একাধিক দুর্ঘটনায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিলেটের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ছিল সারা দেশের রেল যোগাযোগ।
১৭৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সিলেট-আখাউড়া রেলপথ সিলেট বিভাগের লাখো মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। একই সঙ্গে দেশের চা শিল্প, পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ করিডরও এটি। কিন্তু দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, শতবর্ষী রেললাইন, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু-কালভার্ট, লোকোমোটিভ সংকট এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিতে রুটটি দিন দিন হয়ে উঠছে অনিরাপদ।
এ বাস্তবতার মধ্যেই অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে। গত ২ মে সিলেটে এক কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা-সিলেট রেলপথ আধুনিকায়ন এবং ডাবল লাইনে উন্নীত করার পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বিদ্যমান অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, রেলপথের বিভিন্ন অংশে অবকাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শ্রীমঙ্গলের ব্যবসায়ী আশিক মিয়ার ভাষায়, রেলপথকে সবচেয়ে নিরাপদ পরিবহন বলা হলেও সিলেট-আখাউড়া সেকশনে এখন সেই আস্থা কমে যাচ্ছে। প্রায়ই ইঞ্জিন বিকল হয়, ট্রেন আটকে যায়, ভেঙে পড়ে শিডিউল।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, রুটটির বিভিন্ন স্থানে রেললাইনের ক্লিপ, নাট-বল্টু, ফিশপ্লেট ও স্লিপার মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও রয়েছে পাথরেরও ঘাটতি। লাউয়াছড়া বনাঞ্চল, ভানুগাছ-শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া-বরমচাল এবং ফেঞ্চুগঞ্জের কয়েকটি অংশকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গলসহ কয়েকটি স্টেশনের স্টেশনমাস্টারদের ভাষ্য, একটি ট্রেন দেরি করলেই ভেঙে পড়ে পুরো সময়সূচি। কোনো দুর্ঘটনা বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো সিলেট-আখাউড়া রুটেই। ফলে একটির পর একটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের বাইরে চলতে বাধ্য হয়।
রেলওয়ের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে কুলাউড়ার বরমচালে উপবন এক্সপ্রেসের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় চার যাত্রী নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হন। একই বছরে মাইজগাঁও, মল্লিকপুর ও শ্রীমঙ্গলেও একাধিক লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালে মোগলাবাজার এলাকায় উদয়ন এক্সপ্রেসের কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে সিলেটের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় সাময়িকভাবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে চলতি বছরও সে ধারাবাহিকতা থামেনি। গত ১ এপ্রিল হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলা এলাকায় তেলবাহী ট্রেনের ছয়টি ট্যাংকার লাইনচ্যুত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ৫০০ মিটার রেললাইন। এতে দীর্ঘ সময় সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল। এরপর ২৯ মে কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে আবারও একটি তেলবাহী ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হলে কয়েক ঘণ্টা রেল চলাচল বন্ধ ছিল।
তবে দুর্ঘটনার পেছনে শুধু রেললাইনের দুর্বলতাই নয়, রয়েছে যান্ত্রিক সংকটও। রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, অবকাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি লোকোমোটিভ সংকটও দুর্ঘটনা এবং বিলম্বের অন্যতম কারণ। নিয়ম অনুযায়ী একটি ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ইঞ্জিনকে বিশ্রাম দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কথা থাকলেও সংকটের কারণে একই ইঞ্জিন দ্রুত অন্য ট্রেনে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে মাঝপথে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ঘটনা বাড়ছে এবং প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ট্রেন বিলম্বে চলাচল করছে।
রেল কর্তৃপক্ষ উন্নয়নকাজের অগ্রগতির কথা জানালেও যাত্রীদের প্রত্যাশা নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী (পূর্ব) মো. তানভিরুল ইসলাম জানালেন, নিয়মিত রেললাইন পরিদর্শন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশে চলছে মেরামত কাজ। সিলেট-আখাউড়া রেলপথ পুনর্বাসনের দুটি প্যাকেজের কাজ এরই মধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। পাশাপাশি আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ নির্মাণ প্রকল্প আবার চালুর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে সম্প্রতি।




