দশমিনা
এক দশক ধরে ভাঙা সেতু, দুর্ভোগে ১০ গ্রামের মানুষ

ছবি: আগামীর সময়
পটুয়াখালীর দশমিনার জমির মৃধা বাজার এলাকায় সুতাবাড়িয়া নদীর ওপর নির্মিত একটি সেতু ভেঙে পড়ে আছে এক দশক ধরে। এতে নদীর দুই পাড়ের ১০টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে ছোট ডিঙি নৌকায় নদী পারাপার হতে হচ্ছে তাদের। দীর্ঘ সময়েও সেতুটি পুনর্নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর বালুবোঝাই একটি কার্গোর ধাক্কায় সেতুটির মাঝখানের অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। এ সময় চার শিশুসহ পাঁচজন নদীতে পড়ে যান। তাদের মধ্যে চারজন সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও স্থানীয় রফাতুল আলমের পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে নুরসাত জাহান নিখোঁজ হয়। পাঁচ দিন পর নদীতে তার মরদেহ ভেসে ওঠে। দুর্ঘটনায় বালুবোঝাই কার্গোটিও নদীতে ডুবে যায়। সেই ঘটনার পর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেতুটি পুনর্নির্মাণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। লোহার বিমের ওপর কংক্রিটের স্ল্যাব বসিয়ে নির্মিত সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫০ ফুট। এর মাঝখানের প্রায় ২৫ ফুট অংশ ভেঙে নদীতে পড়ে যায়। এরপর থেকেই সেতুটি দিয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেতুর পূর্ব পাড়ে বড় গোপালদী বাজার, জাফরাবাদ ও তাফালবাড়িয়া এলাকা রয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিম পাড়ে রয়েছে জমির মৃধা, রামভল্লক, চিকার ব্রিজ, খারিজা বেতাগী, দাবাড়ি, রুনুয়া ও হুডি বন এলাকা। দুপাড়ের এসব এলাকার প্রায় সাত হাজার বাসিন্দাকে উপজেলা সদরে যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সেতুটি ব্যবহার করতে না পেরে তাদের প্রায় ২০ কিলোমিটার ঘুরে আরীপুরা বাজার হয়ে উপজেলা সদরে যেতে হয়। এ ছাড়া পশ্চিম পাড়ে রয়েছে খারিজা বেতাগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
সেতুর অভাবে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের ছোট ডিঙি নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে স্রোত বাড়লে পারাপারের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে বিদ্যালয়ে যাতায়াতকারী শিশুশিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। পাশাপাশি স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা নারী, শিশু ও অসুস্থ রোগীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
খারিজা বেতাগী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাসুদ পারভেজ ও মুনিয়া জানায়, প্রতিদিন ছোট ডিঙি নৌকায় নদী পার হয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাদের। এতে অনেক সময় নষ্ট হয়। পাশাপাশি প্রতিবারই দুর্ঘটনার আতঙ্ক নিয়ে নৌকায় উঠতে হয়। বৃষ্টি হলে কিংবা নদীতে স্রোত বাড়লে ভয় আরও বেড়ে যায়। সেতুর অভাবে নিয়মিত পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত সেতুটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানায় তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা শুভ মিয়া জানিয়েছেন, ভাঙা সেতুর পাশেই একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। একসময় অসংখ্য শিক্ষার্থীসহ দুই পাড়ের মানুষ এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করতেন। এখন তাদের ছোট নৌকায় নদী পার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে দেখে কষ্ট হয়। আর কোনো প্রাণহানির অপেক্ষা না করে দ্রুত সেতুটি পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী হারুন মৃধা জানান, একটি সেতু শুধু নদীর দুই পাড়কে সংযুক্ত করে না; এটি মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, জীবিকা ও নিরাপদ চলাচলের অন্যতম মাধ্যম। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তাই আর আশ্বাস নয়, দ্রুত প্রকল্প গ্রহণ করে সেতু নির্মাণের কার্যকর পদক্ষেপ চান দুই পাড়ের মানুষ।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এ টি এম সাদিকুর রহমান জানান, সরেজমিন সেতুটি পরিদর্শন ও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হবে। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদ হাসান মৃধা জানিয়েছেন, সেতুটি এলজিইডির আওতাধীন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যায় কি না, তা দেখা হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি পাঠানো হবে।




