এমপি নজরুলের ভিডিওকাণ্ডে বেকায়দায় জামায়াত, বিএনপির বিক্ষোভ-উচ্ছ্বাস

এমপি গাজী নজরুলের ভিডিওকাণ্ডে সাতক্ষীরায় বিক্ষোভ— সংগৃহীত
জামায়াতে ইসলামী থেকে সদ্য বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিওকে কেন্দ্র করে শ্যামনগরে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। ভিডিও প্রকাশের পর স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে অস্বস্তি ও বিব্রতকর পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ, মানববন্ধন, সমাবেশ ও আনন্দ মিছিল করেছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এমপির পদ বাতিল এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে দলটির নেতারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই দিন ধরে শ্যামনগরে জামায়াতের কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। প্রথমসারির নেতাদেরও প্রকাশ্যে তেমন দেখা যায়নি। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির কারসাজি বলে যে প্রচার চালানো হয়েছিল, পরে ভিডিওর সত্যতা প্রকাশ পাওয়ার পর জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীরা তাদের নিজ নিজ আইডি থেকে সেই পোস্টগুলো সরিয়ে নেন।
অন্যদিকে ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। গতকাল বুধবার সকালে ‘শ্যামনগরের সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। বিকালে জামায়াতের পক্ষ থেকে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের ঘোষণা আসার পর বিএনপি কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের মিষ্টি বিতরণ করতে দেখা যায়। এই আসনে উপনির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তাদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা ও উচ্ছ্বাসও লক্ষ করা গেছে।
ঘটনা সম্পর্কে শ্যামনগরের জামায়াত নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা জামায়াতের দুজন দায়িত্বশীল নেতা হতাশা প্রকাশ করে জানান, একটি উদীয়মান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পদে না থেকেও একজন সংসদ সদস্য যেভাবে দলকে বিতর্কিত করেছেন, তার মাশুল পুরো সংগঠনকে দিতে হচ্ছে। এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সময়সাপেক্ষ।
বিষয়টি নিয়ে উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও সাবেক ডাকসু নেতা অধ্যাপক আবু সাঈদ মন্তব্য করেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগে শুধু দল থেকে বহিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়। নীতি ও আদর্শের প্রমাণ দিতে তাকে জাতীয় সংসদ থেকেও অপসারণ করা উচিত। একই সঙ্গে বেহালিপনা ও তা ঢাকার চেষ্টার অভিযোগে তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় আনার দাবি জানান তিনি।
উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সোলায়মান কবীর বললেন, ‘জামায়াতদলীয় এই এমপির অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।’ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে থাকার নৈতিক অধিকার তিনি হারিয়েছেন উল্লেখ করে তার সদস্যপদ বাতিলের উদ্যোগ নিতে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াত থেকে গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের ঘোষণা আসার পর বুধবার সন্ধ্যায় ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে শ্যামনগর পৌর সদরে একটি আনন্দ মিছিল বের করা হয়। বিএনপি কার্যালয় থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি উপজেলার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। একই সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচিও অব্যাহত রাখে।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গাজী নজরুল ইসলামকে দুর্নীতিবাজ ও চরিত্রহীন উল্লেখ করে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল এবং তাকে আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবিতে শ্যামনগরের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন বিএনপিপন্থীরা। আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনার পর বক্তব্য দেন মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম। অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তিনি বললেন, ‘ঘটনাটি জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে এবং এর কারণে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে তার দাবি। তিনি বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনে সংসদ সদস্যের পদত্যাগের আহ্বান জানান।
একই দিন নুরনগর, ঈশ্বরীপুর ও কাশিমাড়ী ইউনিয়নেও বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। নুরনগর বাজারের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন নুরনগর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম আলমগীর। ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের বংশীপুর বাজারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও গ্রাম চিকিৎসক আব্দুল হালিমের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন শ্যামনগর উপজেলা ঠিকাদার কল্যাণ সমিতির সভাপতি আছাদুল্লাহ বাহার (আছু), অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম খলিল এবং ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সাদেকুর রহমান। কাশিমাড়ী বাজারের সমাবেশে বক্তব্য দেন নাগরিক নেতা ও উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সোলাইমান করির, উপজেলা বিএনপির নেতা আব্দুর রশিদ ঢালী এবং ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আজিজুল ঢালীসহ অন্যরা।
সমাবেশে বক্তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানান। তাদের বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, বিষয়টি জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে তারা সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের পদত্যাগ এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। বক্তারা আরও জানান, তাদের দাবির বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলবে।





