আগামীর সময়

২০০ বছরের বাদুড়সাম্রাজ্য : মধু জোয়ার্দ্দার ছেড়ে দিয়েছেন জমি, কাটেননি গাছ

২০০ বছরের বাদুড়সাম্রাজ্য : মধু জোয়ার্দ্দার ছেড়ে দিয়েছেন জমি, কাটেননি গাছ

ছবিঃ আগামীর সময়

দূর থেকে শব্দ শুনেই বুঝা যায় যে, কাছাকাছি কোথাও বাদুড়ের অভয়ারণ্য রয়েছে। দুইশ' বছরের পুরনো এই বাদুড়দের নিজস্ব সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার পাশে ওয়াপদা পাড়ায়।

অসংখ্য বাদুড় ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চিঁচিঁ শব্দে মুখরিত করে রাখে বাদুড়তলা। দিনে বাদুড়গুলো চারটি তেঁতুলগাছের ডালে ঝুলে থাকে আর এ ডাল থেকে ও ডালে ছুটে বেড়ায় আর সন্ধ্যা হলেই খাবারের জন্য বেরিয়ে পড়ে।

চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার পাশে ওয়াপদাপাড়ায় রয়েছে বাদুড়তলা নামক স্থান। ইবাদত আলি জোয়ার্দ্দার নামের এক ব্যাক্তি প্রায় ২০০ বছর আগে এখানে সপরিবারে বসবাস করতেন। ইবাদত আলি জোয়ার্দ্দারের ছেলে ইউসুফ আলি জোয়ার্দ্দারের দুই মেয়ে সেলিমা খাতুন ও হাসিনা খাতুন।

বাবা মারা যাওয়ার পর তার দুই মেয়ে বাদুড়তলার সম্পত্তির ভাগ পায় জনপ্রতি প্রায় সাড়ে চার বিঘা করে। সেলিমা খাতুন সন্তানদের নিয়ে স্থায়ীভাবে চুয়াডাঙ্গায় বসবাস করেন। আর হাসিনা খাতুন পরিবার নিয়ে থাকেন ঢাকায়।

সেলিমা খাতুনের বড় ছেলে খোকন জোয়ার্দ্দার বলছেন, ১৯২৫ সালে সর্বশেষ বাদুড়তলায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নানা ও মায়ের মুখ থেকে বাদুড়ের গল্প শুনেছি। তারা বলতেন, অনেক বছর ধরে বাগানে বাদুড় বসবাস করছে। তাই গাছগুলো কখনো কাটার চিন্তা করা হয়নি। অনেক আগে ১৯৬০ সালে বেশ কয়েকদিন তাপদাহ হয়েছিল। সেই তাপদাহের কারণে বাদুড় মরে যাচ্ছিল।

তিনি আরও বললেন যে, তার নানা ভারত থেকে একটি পানি ছিটানোর মেশিন কিনে নিয়ে আসেন। ওই মেশিন দিয়ে বেশ কয়েকদিন পানি ছিটানো হলে বাদুড়গুলো প্রাণে রক্ষা পায়।

সেলিমা খাতুনের ৯ ছেলে-মেয়ে চুয়াডাঙ্গা ওয়াপদাপাড়ার বাদুরতলার জমি ওয়ারিশ সুত্রে পেয়েছেন। তারা বাদুড়গুলো সংরক্ষণের জন্য নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছেন।

সেলিমা খাতুনের ছেলেদের কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বাসা আছে। মেজো ছেলে মধু জোয়ার্দ্দারের জমির মধ্যে পড়েছে চারটি তেঁতুলগাছ। গাছগুলোতে রয়েছে বাদুড়ের নিরাপদ আশ্রায়। সে কথা চিন্তা করেই গাছ চারটি না কেটে মধু জোয়ার্দ্দার তিন কাঠা জমি ছেড়ে দিয়েছেন। বর্তমানে এ জমির মূল্য কোটি টাকারও বেশি। চারটি তেঁতুলগাছে প্রায় তিন হাজার বাদুড় বসবাস করছে।

এই তেঁতুল গাছগুলোতে প্রায় দুইশ' বছর ধরে বাদুড়রেরা গড়ে তুলেছে নিজস্ব সাম্রাজ্য। তেঁতুলগাছ থেকে তেঁতুলও পাড়া হয়না। শুধু তাদের খাবারের জন্য রাখা হয় বছরের পর বছর। গাছের ডালে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঝুলে থাকে বাদুড়গুলো। দিনের বেলায় এই স্তান্যপায়ী প্রাণিগুলো চোখে বেশি দেখে না, তাই গাছের ডালে ঝুলে থাকে। আর এ ডাল থেকে সে ডালে ছুটে বেড়ায়। সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথেই বাদুড়গুলো খাবারের জন্য ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে যায় দুর-দুরান্তে। খাবার খেয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই ফিরে আসে আপন ঠিকানায়।

বাদুড়ের বসবাসের কারণে এ এলাকার নামকরণ হয়েছে বাদুড়তলা। স্থানীয়রাও বাদুড়তলা নামে চেনেন স্থানটিকে।  বাদুড়ের নামে বাদুড় মার্কা আটা, ময়দা, সুজি ও ভূসির নামকরণ করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গাসহ পার্শবর্তী জেলার বাজারে বাদুড় মার্কা পণ্যগুলোর চাহিদাও রয়েছে অনেক।

বিলুপ্তপ্রায় এ প্রাণীটি দেখতে দুর-দুরন্ত থেকে সব বয়সের মানুষ ছুটে আসেন। বাদুড়ের অবাধ বিচরণ দেখে তারা মুগ্ধ হন। এ প্রাণীটি বর্তমানে অন্য কোথাও তেমন একটা দেখা যায় না। ছোট বাচ্চারা বাবা-মায়ের সাথে বারবার আসে স্তন্যপায়ী এ প্রাণিগুলো দেখতে।

ঝিনাইদহ জেলার ফতেপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলছেন, অনেকের মুখে গল্প শুনেছি বাদুড়ের। তাই দেখতে ছুটে আসলাম বাদুড়তলায়। বাদুড়ের ডাক শুনে আমি মুগ্ধ। এত বাদুড় এক সাথে কখনো দেখিনি আগে।

চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার বিশিষ্ট রাজনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তোহিদ হোসেন বললেন, ছোটবেলা থেকে গাছে বাদুড় দেখছি। সকালে ঘুম ভাঙার পর বাদুড়ের চিঁচিঁ শব্দ শুনতাম। বাদুড় এক সাথে আকাশে উড়ত। রাতে খাবার খেয়ে সারাবেলা গাছে থাকত বাদুড় গুলো। বর্তমান পরিবেশে টিকে থাকার লড়াই করছে এরা।

জমির মালিকের ভাই জাহিদ মিয়া জানান, প্রাণিগুলো নিজের সন্তানের মতো। তাদের উপর দরদ ও ভালবাসা জন্মেছে। নিরীহ প্রাণিগুলোর দ্বারা কোনো ক্ষতি হয়নি। প্রাণিগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য জমি ছেড়ে দিয়েছি। আমার সন্তানদের বলেছি বাদুড়ের পুরাতন আবাসস্থল নষ্ট না করার জন্য।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ সিদ্দিকুর রহমান জানান, বাদুড় স্তন্যপায়ী প্রাণী। দিনে গাছে থাকে, রাতে খাদ্যের জন্য বিচরণ করে। পৃথিবী থেকে অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। বাদুড় দেশ থেকে বিলুপ্তির পথে। সেজন্য এর আগেই বিলুপ্তি ঠেকাতে বাদুড় সংরক্ষণ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।  এছাড়াও পরিবেশ সংরক্ষণে বাদুড়ের ভূমিকা রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, মধু মিয়া একজন প্রাণী প্রেমিক ব্যক্তি। চারটি তেঁতুলগাছে প্রায় তিন হাজার বাদুড়ের নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে। বাদুড় ফল খেয়ে বেঁচে থাকে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। বাদুড়ের মাধ্যমে খুব সহজে পরাগায়ন হচ্ছে উদ্ভিদের। বাদুড় বীজ ফেলে অথবা ফল মুখে করে নিয়ে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে ফেলে দেয়। এতে করে উদ্ভিদের পরাগায়ণে সাহায্য হয়। এমনকি বিরল প্রজাতির অনেক উদ্ভিদেরও বংশবিস্তার সম্ভব এই বাদুড় গুলোর মাধ্যমে।

    শেয়ার করুন: