আগামীর সময়

নানা আঘাতে ধসেছে ইতালির ফুটবল প্রাসাদ

নানা আঘাতে ধসেছে ইতালির ফুটবল প্রাসাদ

টানা তৃতীয়বার বিশ্বকাপে নেই ইতালি। ছবি: সংগৃহীত

ইতালি কি ফুটবলের ওয়েস্ট ইন্ডিজ হয়ে গেল? একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখানো দল কি না পরপর তিন বিশ্বকাপে জায়গাই করে নিতে পারল না? নাকি বিশ্বকাপে তাদের সঙ্গী হয়েছে কোনো অভিশাপ?

১৯৩৪ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জেতা দলটি ২৪ পর প্রথমবারের মতো বাছাই পর্ব উতরাতে পারেনি ১৯৫৮ সালে। এটা দুর্ভাগ্য। এরপর জেতে আরও তিনটি বিশ্বকাপ শিরোপা। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের জটিল সমীকরণ, প্লে-অফের ভাগ্যচক্র; সব মিলিয়ে ২০১৮ বিশ্বকাপ থেকে ইতালি যখন সুইডেনের কাছে হেরে বাদ পড়ে, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন নীল ঘোড়া স্রেফ হোঁচট খেয়েছে, হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায়নি।

বছর দুয়েক পর সেই ইতালিই ইউরো জিতল, নকআউটে টানা তিন ম্যাচে বেলজিয়াম, স্পেন আর ইংল্যান্ডকে হারিয়ে। অথচ ২০২২ বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে ফের আটকে গেল আজ্জুরিরা, নর্থ মেসিডোনিয়ার কাছে হেরে!

এরপর বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা দলের সংখ্যা বাড়িয়েছে ফিফা, ইউরোপের দল সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু ইতালির ভাগ্য বদলায়নি। এবার ইতালির পথের কাঁটা বসনিয়া হারজেগোভিনা। প্লে-অফে বসনিয়া হার্জেগোভিনার কাছে টাইব্রেকারে ৪-১ গোলে হেরে টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে ইতালি।

জিদানের গুঁতোয় অভিশাপ

কেউ বলেন, জিনেদিন জিদানের অভিশাপেই সর্বনাশ হয়েছে ইতালির। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে ইতালির মার্কো মাতেরাজ্জি জিদানের বোনকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন ফরাসি কিংবদন্তিকে। সেই তর্কের জেরে জিদান মাথা দিয়ে গুঁতো মারেন মাতেরাজ্জিকে, দেখেন লাল কার্ড। ফাইনালটা টাইব্রেকারে হেরে যায় ফ্রান্স। এরপর ২০১০ সালের বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচ না জিতেই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়, ২০১৪ বিশ্বকাপেও ইতালিয়ানরা পারেনি গ্রুপ পর্বের বাধা পার করতে। ২০১৪ সালের ২৪ জুন উরুগুয়ের বিপক্ষে হেরে যাওয়া ম্যাচটাই গত ১২ বছরে ইতালির সবশেষ বিশ্বকাপ উপস্থিতি।

পেট্রো ডলারহীন ইতালি ফুটবল

কেউ কেউ বলেন, পেট্রো ডলারের ঝনঝনানিতে ইউরোপের অন্য অনেক দেশের লিগ যেভাবে বিশ্বের সেরা তারকাদের আকর্ষণ করেছে, ইতালির সিরি-এ সেরকম আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেনি। ইংল্যান্ডে ম্যানচেস্টার সিটি ও নিউক্যাসল, ফ্রান্সে প্যারিস সেন্ত জার্মেই যেভাবে আগ্রাসী হয়ে খেলোয়াড় কিনেছে, ইতালির এসি মিলান এবং ইন্টার মিলান কিংবা জুভেন্টাসের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলো এ দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছে। বৈশ্বিক তারকাদের অনুপস্থিতির কারণে সিরি-এ’র সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রিতেও পড়ে ভাটার টান।

অর্থ কেলেঙ্কারি, মাফিয়া ও পাতানো খেলায় ধুঁকছে

ইতালিয়ান ক্লাবগুলোকে ঢেকে আছে অনেক আর্থিক কেলেঙ্কারির ছায়া। ২০০৬ সালেই জুভেন্টাসের কুখ্যাত কালচোপোলি কেলেঙ্কারি, যার সঙ্গে জুড়ে আছে ম্যাচ পাতানো, আর্থিক অনিয়ম, কৃত্রিমভাবে খেলোয়াড়দের দাম বাড়িয়ে দেখানো ও নীতিনির্ধারকদের ক্লাবের আয়-ব্যয় নিয়ে গড়াপেটা করা ব্যালান্সশিট প্রদান করাসহ অনেক অনিয়মই উঠে এসেছিল।

করোনা মহামারীর সময় জুভেন্টাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, খেলোয়াড়রা চার মাসের বেতন নেননি, এরপর কাগজে কলমে দেখানো হয় খেলোয়াড়রা স্রেফ এক মাস বেতন নেননি, এর মধ্যে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর পাওনা ছিল ২০ মিলিয়ন ইউরো। জুভেন্টাস এখনো উয়েফার নজরদারির আওতায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ভাগে তুরিনের ক্লাবটি ২.৫ মিলিয়ন ইউরো লোকসান দেখিয়েছে। চীনা প্রতিষ্ঠান সুনিং ২০১৬ সালে ২৭০ মিলিয়ন ইউরোতে কিনেছিল ইন্টার মিলানের ৭০ ভাগ শেয়ার, পাঁচ বছরের মাথায় তারা প্রায় ২৪৫ মিলিয়ন ইউরো লোকসান করেছে।

এরপর দেনার দায়ে সুনিং ক্লাবের মালিকানা হস্তান্তর করে দিয়েছে মার্কিন পুঁজি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ওকট্রি ক্যাপিটালের কাছে। মিলানের বিখ্যাত মাঠ সানসিরো, যেটা এসি মিলান এবং ইন্টার মিলানের ঘরের মাঠ, সেই স্টেডিয়াম ভেঙে নতুন করে ৭০ হাজার আসনের স্টেডিয়াম বানানো ও ভূমি বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মের তদন্ত করছে মিলান পুলিশ। মিলান শহরের নগর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজশে জনস্বার্থ উপেক্ষা করে স্থাপনা ও জমি বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

যেখানেই আর্থিক অনিয়ম, সেখানেই মাফিয়ার অদৃশ্য উপস্থিতি। ইতালির ক্লাবগুলোর উগ্র সমর্থক, যাদের বলা হয় ‘আল্ট্রা’, তাদের মাধ্যমেই ক্লাবগুলোকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে অপরাধী সংগঠনগুলো। এর মাধ্যমে চলে ম্যাচ পাতানো, সমঝোতা আর প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের এক অদৃশ্য লড়াই।

মালদিনির দেশে প্রতিভারও আকাল!

শুধুই যে আর্থিক অনিয়ম ইতালির ক্লাবগুলোকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে, এমনটাই ইতালির বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার একমাত্র কারণ নয়। প্রতিভাবান ফুটবলার উঠে না আসাটাও একটা বড় কারণ। এই সময়ে বিশ্বমঞ্চে ইতালির সবচেয়ে প্রতিভাবান ফুটবলার মনে করা হয় সান্দ্রো তোনালিকে। ২০২৩ সালে এসি মিলান থেকে এ মিডফিল্ডারকে দলে নিয়েছিল নিউক্যাসল, আনুষ্ঠানিকভাবে তার চুক্তির অর্থ প্রকাশ না করা হলেও ধরে নেওয়া হয় সেটা ৭০ মিলিয়ন ইউরোর আশপাশে, যা তাকে করে তুলেছে সবচেয়ে দামি ইতালিয়ান ফুটবলার।

আন্দ্রে পিরলোর উত্তরসূরি তাকে মনে করা হলেও দাম এবং নামের প্রতি এখনো পুরোপুরি সুবিচার করতে পারেননি তোনালি। নিউক্যাসলে তিন মৌসুমে ১০৪ ম্যাচে মাত্র ১০ গোল। যদিও বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে প্লে-অফের প্রথম রাউন্ডে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম গোলটা তোনালিই করেছিলেন। তবে সত্যিটা হচ্ছে; পাওলো মালদিনি, ফ্যাবিও ক্যানাভারো, আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরোদের সত্যিকারের উত্তরসূরি খুঁজে পাচ্ছে না ইতালি।

খেলোয়াড়দের প্রতিভার ঘাটতি পুষিয়ে যেতে পারে কোচের উপযুক্ত কৌশলে। সেখানেও যে বারবার পরিবর্তনে ঘটেছে ছন্দপতন। রবার্তো মানচিনি দায়িত্বে ছিলেন ২০১৮ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত, তার সময়ে ইতালি ইউরো জিতেছে এবং উয়েফা নেশনস লিগে তৃতীয় স্থানে থেকে শেষ করেছে পরপর দুটো মৌসুমে।

মানচিনির বিদায়ের পর লুসিয়ানো স্পালেত্তি দায়িত্বে ছিলেন বছর দুয়েক। বাছাই পর্বে নরওয়ের কাছে ৩-০ গোলে ইতালির হারের পর বরখাস্ত হন স্পালেত্তি, দায়িত্ব দেওয়া হয় গাত্তুসোকে। ইতালির সাবেক এ ডিফেন্ডার কোচ হিসেবে কোথাও বছর দুয়েকের বেশি কাজ করতে পারেন না। ২০১১ সালে উয়েফার ‘এ’ লাইসেন্স নেওয়ার পর ১১টি দলের দায়িত্ব নিয়ে এবং ছেড়ে ১২তম দায়িত্ব হচ্ছে ইতালির জাতীয় দলের কোচের। বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন না করায় হয়তো তাকে দায়িত্বটাও ছাড়তে হবে!

পরিশেষে

২০১৪-এর পর টানা তিন বিশ্বকাপে কেন ইতালি খেলতে পারছে না, তার কোনো একক মৌলিক কারণ হয়তো নেই। তবে অনেক ছোট ছোট কারণের যোগফল এবং সেসবের সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়াই ধীরে ধীরে ক্ষয় ধরিয়েছে ইতালির ফুটবল প্রাসাদে। খসে পড়েছে বহিরঙ্গের পলেস্তারা, ভেতরের ঝাড়বাতি। তাইতো ইতালি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলে আর ফুটবল বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে!

    শেয়ার করুন: