ভোট দেননি যারা, এই সরকার তাদেরও : তারেক রহমান

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ মঙ্গলবার রংপুরের ঐতিহাসিক ধর্মসভা (রাধা গোবিন্দ মন্দির) পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
বিএনপি যখন সরকারে, তখন কেউ বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন না বলে জানালেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার দেশের সব মানুষের সরকার হতে চায়, যারা ভোট দিয়েছেন, তাদেরও; যারা ভোট দেননি, তাদেরও।’
আজ মঙ্গলবার রংপুরের ঐতিহাসিক ধর্মসভা (রাধা গোবিন্দ মন্দির) পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের সময় একথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বানও তিনি জানান।
তার ভাষ্যে, সরকারের দায়িত্ব হলো সব এলাকার মানুষের জন্য কাজ করা এবং দেশের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভারসাম্য বজায় রাখা।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ে আজ রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী। সকালে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে সৈয়দপুর হয়ে কয়েকটি পথসভা করে রংপুর পৌঁছান তিনি।
ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মন্দির কমিটির সভাপতি ভবতোষ সরকার বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের রংপুর জেলা শাখার সভাপতি রামজীবন কুণ্ডু, মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত কুমার রায় এবং মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ।
প্রধানমন্ত্রী মণ্ডপে উপস্থিত ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। ভক্তদের অনুরোধে তাদের সঙ্গে সেলফিও তোলেন তিনি।
মন্দিরে আয়োজিত শুভেচ্ছা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সাম্প্রতিক সময়ের গণঅভ্যুত্থান-প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে সব ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষ সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রেখেছেন। এই ঐক্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও সব ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষের একসঙ্গে অংশ নেওয়ার কথা বলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
‘এই দেশটি হাজার বছর ধরে সকল ধর্মের মানুষকে নিয়ে এগিয়ে চলছে। শান্তিতে আমরা সকলে মিলে বসবাস করছি। আমরা চাই, আগামী হাজার বছরেও যেন আমরা একসঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারি,’ বলেন তিনি।
দেশের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি জানান, রংপুর মহানগরীর উন্নয়নে এরই মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে জেলা পরিষদ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে মানুষের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। গ্রাম ও স্থানীয় পর্যায়ে সেতু-কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে মানুষের কাছে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দিতে সরকারের চেষ্টার কথাও তিনি বলেন।
‘এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং পারস্পরিক বিভেদ ভুলে দেশের উন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে,’ আহ্বান রাখেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চায় জানিয়ে তিনি বলেন, তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি মহল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। অতীতেও বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হয়েছিল, যার পরিণতি ভালো হয়নি।
‘কারও কোনো বক্তব্য বা দাবি থাকলে তা সংসদে উপস্থাপন করে আলোচনা করা যেতে পারে,’ বলেন তিনি।
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে যেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান ব্যাহত না হয়, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, অতীতের রাজনৈতিক চর্চায় পরিবর্তন আনতে সরকার কাজ করছে; তবে সেই পরিবর্তন বাস্তবায়নে জনগণই সবচেয়ে বড় শক্তি। এ জন্য জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
রাধা গোবিন্দ মন্দিরের পেছনে হোস্টেলের মতো একটি অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে আর্থিক সহযোগিতার সম্ভাবনা পর্যালোচনা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে মন্দির কমিটির সভাপতি ভবতোষ সরকার বাচ্চু ও সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার প্রধানমন্ত্রীর হাতে একটি ক্রেস্ট তুলে দেন। প্রধানমন্ত্রী মন্দির কর্তৃপক্ষকে ১০ লাখ টাকার একটি চেক দেন।
স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুণ্ডু, সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলাল ও নিপুণ রায় চৌধুরী, ছাত্রদল নেতা পার্থ দেব, গণেশ চন্দ্র রায় সাহস অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ উপস্থিত ছিলেন।
সকাল ৯টায় ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে বিমানবাহিনীর একটি বিমানে সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান সামু, বিভাগীয় কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম, ডিআইজি আমিনুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সড়কপথে রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরে আয়োজিত দুটি পথসভায় তিনি বক্তব্য দেন। তাকে স্বাগত জানাতে সড়কের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক বিএনপি নেতাকর্মী অবস্থান নিয়েছিলেন। গাড়িবহর থেকে হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী।
পথসভাগুলোতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করতে চায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম রংপুর সফর। রংপুরের কর্মসূচি সেরে তার রাজশাহী এবং সেখান থেকে তিনি চট্টগ্রাম যাবেন। রাতেই তার ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।





