হবিগঞ্জ
তুচ্ছতেই ভাঙছে সংসার, বছরে হাজার ছাড়াল তালাক

ছবি: এআই নির্মিত
হবিগঞ্জে গত এক বছরে ১ হাজার ৬৩টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। একই সময়ে জেলায় বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে ১৩ হাজার ৭৯৯টি। পারিবারিক কলহ, শাশুড়ি-পুত্রবধূর দ্বন্দ্ব, স্বামী-স্ত্রীর দীর্ঘদিন আলাদা থাকা, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং তুচ্ছ বিষয়েও দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র জানায়, গত বছরের ১ মে থেকে চলতি বছরের ৩০ মে পর্যন্ত জেলার আট উপজেলায় ৮১ জন কাজী ১৩ হাজার ৭৯৯টি বিয়ে এবং ১ হাজার ৬৩টি তালাক নিবন্ধন করেছেন। এক বছর আগের একই সময়ের তুলনামূলক তথ্য কার্যালয়টির কাছে নেই।
উপজেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় ১৬ জন কাজীর মাধ্যমে ২ হাজার ৬১০টি বিয়ে ও ১৫৮টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে। বাহুবলে ১৪ জন কাজী ৩ হাজার ১৬৮টি বিয়ে ও ৩৩৮টি তালাক, আজমিরীগঞ্জে একজন কাজীর মাধ্যমে ৩৫০টি বিয়ে ও ৯টি তালাক, মাধবপুরে ১২ জন কাজী ২ হাজার ৭১টি বিয়ে ও ১৬৩টি তালাক, নবীগঞ্জে ১৭ জন কাজীর মাধ্যমে ৩ হাজার ৯৮টি বিয়ে ও ২৫১টি তালাক, বানিয়াচংয়ে সাতজন কাজীর মাধ্যমে ১২৫টি বিয়ে ও ৪টি তালাক, চুনারুঘাটে সাতজন কাজীর মাধ্যমে ৬১৩টি বিয়ে ও ৩৮টি তালাক এবং লাখাইয়ে সাতজন কাজীর মাধ্যমে ১ হাজার ৭৬৪টি বিয়ে ও ১০২টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে।
জেলায় নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারের অনুমোদিত পদ ৯৬টি। এর মধ্যে সাতটি পদ শূন্য। দায়িত্বে থাকা ৮৯ জন কাজীর মধ্যে দীর্ঘদিন তাগাদা দেওয়ার পরও ৮১ জন তথ্য জমা দিয়েছেন। বাকি আটজন এখনো তথ্য দেননি বলে জানিয়েছে জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রত্যন্ত গ্রামের নারীদের মধ্যেও তালাকের প্রবণতা বাড়ছে। সাবেক জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা ও সাবেক সহকারী জজ সম্পা জাহান উল্লেখ করেন, অনেক ক্ষেত্রে শাশুড়ি ও পুত্রবধূর বিরোধ থেকেই দাম্পত্য কলহের সূত্রপাত হয়। ঘরের কাজ কিংবা ঘুম থেকে আগে বা পরে ওঠার মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়েও বিরোধ তৈরি হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত সংসার ভাঙার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
‘লিগ্যাল এইড অফিসে আসা অনেক পারিবারিক বিরোধ আপস-মীমাংসার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক অস্থিরতা এতটাই গভীর হয় যে বিচ্ছেদ অনিবার্য হয়ে পড়ে। যৌতুকসংক্রান্ত মামলায়ও কখনো কখনো আইনের সুযোগ অতিরিক্তভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা দেখা যায়। এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিরোধ নিষ্পত্তিতে লিগ্যাল এইড অফিস কাজ করছে’— উল্লেখ করেন সম্পা জাহান।
সাম্প্রতিক সময়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও পরকীয়াজনিত সংঘাতও আলোচনায় এসেছে। গত ১৭ মার্চ নবীগঞ্জ উপজেলায় নিজ বাড়ি থেকে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় ফেরদৌসী ইসলাম চৌধুরী (৬৩) নামে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তার পুত্রবধূ তামান্না আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও পরকীয়ার জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। তামান্না আক্তার আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তার পরকীয়া-সম্পর্কের এক যুবকও ঘটনায় জড়িত ছিলেন। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ঝড়ের রাতে ওই যুবক দুই সহযোগীকে নিয়ে তামান্নার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তারা ফেরদৌসী ইসলাম চৌধুরীর মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে হাত-পা বেঁধে হত্যা করেন। পরে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে একই কায়দায় জীবিত তামান্নার হাত-পাও বেঁধে রেখে যান।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের সময় পাওয়া প্রায় পাঁচ ভরি স্বর্ণ ফেরদৌসী ইসলাম চৌধুরীর কাছে ছিল। তার ছেলে প্রবাসে থাকায় শাশুড়ি ও পুত্রবধূর মধ্যে বনিবনা ছিল না। এর মধ্যেই তামান্না ওই যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন।
স্থানীয়রা বলছেন, তামান্নার বয়স মাত্র ২২ বছর। বিয়ের পর থেকেই তার স্বামী প্রবাসে ছিলেন। তবে এ বাস্তবতা পরকীয়ার দায় কমায় না। দোষী প্রমাণিত হলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। খুনের কোনো ক্ষমা নেই।
বানিয়াচং উপজেলার দক্ষিণ-পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা হাবিবুর রহমান মন্তব্য, পারিবারিক দায়িত্ববোধের ঘাটতি, দীর্ঘ সময় স্বামী-স্ত্রীর দূরে থাকা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস থেকে অনেক বিরোধ তৈরি হচ্ছে। এসব সংকট মোকাবিলায় পরিবার ও সমাজ উভয় পর্যায়েই সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
হবিগঞ্জ কাজী সমিতির সাবেক সভাপতি আব্দুল মান্নান জানান, কয়েক বছর আগেও এক বছরে এত তালাক হতো না। সাম্প্রতিক সময়ে পারিবারিক কলহ বেড়েছে। নারী-পুরুষ ও পরিবারের সদস্যরা দিন দিন অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন। এর প্রভাব পড়ছে দাম্পত্য সম্পর্কেও। এ ক্ষেত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একই সুরে কথা বললেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি মো. বাহার উদ্দিন। তার ভাষ্য, গ্রামীণ সমাজে পারিবারিক বন্ধন আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়ছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দূরত্ব, পারিবারিক সহনশীলতার অভাব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্য সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
‘শুধু আইন বা সালিশের মাধ্যমে নয়, পরিবার ও সমাজ উভয় পর্যায়ে মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জোরদার করেও এ সংকট মোকাবিলা করতে হবে’— যোগ করেন বাহার উদ্দিন।




