হামাগুড়ির পথ পেরিয়ে স্কুলে, স্বপ্ন শিক্ষক হওয়ার

ছবি: আগামীর সময়
পা দুটি অচল। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না, হাঁটতেও পারেন না। তবু থেমে নেই ১৬ বছরের আসমা বানু। প্রতিদিন বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হাতের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে পাড়ি দেন তিনি। রোদে পুড়ে কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে সেই পথ পেরিয়ে ওঠেন গাড়িতে। এরপর যান স্কুলে। শরীরের সীমাবদ্ধতা, কাঁচা রাস্তা আর পরিবারের অভাব—কোনোটিই তার পড়াশোনার ইচ্ছাকে থামাতে পারেনি।
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের বাগলপাড়া গ্রামের রাজমিস্ত্রি মতিয়ার রহমানের মেয়ে আসমা বানু। তিন সন্তানের মধ্যে তিনি তৃতীয়।
ছোটবেলা থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। সংসারে অভাব নিত্যসঙ্গী হলেও মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ করেননি বাবা-মা। আর আসমাও যেন প্রতিদিন নিজের সামর্থ্যের সীমাকে একটু একটু করে পেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন।
আসমা বানু বর্তমানে বিরামপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষায় বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তবে অন্য শিক্ষার্থীদের মতো তার স্কুলে যাওয়া-আসা সহজ নয়। বাড়ি থেকে কাঁচা রাস্তা ধরে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হয়। এরপর কোনো গাড়িতে উঠতে পারলে স্কুলে পৌঁছান। ক্লাস শেষে আবার একইভাবে ফিরতে হয় বাড়িতে।
প্রতিদিনের এই পথ কখনো কখনো তার জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় হামাগুড়ি দেওয়ার পর শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। তবু পরদিন আবার বই-খাতা নিয়ে একই পথ ধরেন তিনি।
আসমা বানুর বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, আসমা বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্রী। প্রতিটি পরীক্ষাতেই সে ভালো ফল করে। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করার স্বপ্ন তার। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে পড়াশোনায় সহযোগিতা করা হচ্ছে এবং বিদ্যালয়ের যাবতীয় খরচও ফ্রি করা হয়েছে। তিনি আশা করেন, আসমা এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করবে।
মেয়ে কষ্ট করে প্রতিদিন স্কুলে যায়—এ দৃশ্য কষ্ট দেয় মা কুরশিয়া বেগমকেও। তিনি বলেন, আমার তিন সন্তানের মধ্যে আসমা তৃতীয়। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে স্কুলে যাওয়া তার জন্য অনেক কষ্টের। কিন্তু তার স্বপ্ন শিক্ষক হবে। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে দিনের পর দিন কষ্ট করে যাচ্ছে।
আসমার বাবা মতিয়ার রহমান রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। সীমিত আয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগানোও তার জন্য কঠিন। তিনি বলেন, আমার মেয়ে প্রতিবন্ধী ভাতা পায়। এ কারণে বিদ্যালয় থেকে উপবৃত্তি দেওয়া হয় না। উপবৃত্তি পেলে তার পড়াশোনা আরও সহজ হতো। স্কুলে নিয়ে যাওয়া-আসার জন্য একটি স্কুটি জাতীয় গাড়ি থাকলে মেয়েটার কষ্ট অনেকটাই কমত। কিন্তু রাজমিস্ত্রির কাজ করে সেই গাড়ি কেনার সামর্থ্য আমার নেই।
নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আসমা বানু বলেন, জন্ম থেকেই আমি প্রতিবন্ধী। হাঁটতে পারি না। হামাগুড়ি দিয়ে চলাচল করতে হয়। এভাবেই কষ্ট করে স্কুলে যাই-আসি। আমি উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে সরকারি চাকরি করতে চাই।
তার বড় স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি চাওয়া—সহজে চলাচলের ব্যবস্থা। আসমা বলেন, একটি অটোরিকশা থাকলে স্কুলে যাতায়াতের কষ্ট অনেকটাই কমে যেত। নিজের মতো করে চলাচল করতে পারলে পড়াশোনাটাও আরও ভালোভাবে চালিয়ে যেতে পারতাম।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল আওয়াল বলেন, আসমা যেহেতু সরকারি ভাতা পান, তাই তাকে উপবৃত্তি দেওয়া হয় না। তবে সমাজসেবা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে একটি হুইলচেয়ার দেওয়া হয়েছে। যদিও সেটি স্কুলে যাতায়াতের জন্য খুব একটা উপযোগী নয়, বরং বাড়িতে ব্যবহারের জন্য বেশি কার্যকর। তিনি বলেন, আমরা সাধ্য অনুযায়ী তাকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।






