রাজবাড়ী
কম পুঁজিতে বেশি লাভে তামাকে ঝুঁকছেন কৃষক

ছবিঃ আগামীর সময়
রাজবাড়ীতে ক্রমেই বাড়ছে তামাকের আবাদ। এই ফসল চাষে নিজস্ব কোনো পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয় না। চাষের শুরু থেকেই বীজ, সার ও নগদ অর্থ সরবরাহ করে টোব্যাকো কোম্পানিগুলো। অন্য ফসলের তুলনায় লাভও বেশি হওয়ায় পুঁজি ছাড়াই অধিক মুনাফার আশায় তামাক চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ৩৩ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে। গত বছর ছিল ২৫ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরে ৮ হেক্টর জমিতে আবাদ বেড়েছে।
জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলায় ১০ হেক্টর করে তামাকের আবাদ হয়েছে। কালুখালী উপজেলায় ৮ হেক্টর, বালিয়াকান্দিতে ৪ হেক্টর এবং পাংশায় ১ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের চরনারায়ণপুর, বেনীনগর, মহাদেবপুর এবং কালুখালীর মহেন্দ্রপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের পাশে রশিতে সারি সারি তামাক পাতা ঝুলছে। কোথাও বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে পাতা শুকানো হচ্ছে। অনেক জায়গায় পাতা প্রায় শুকিয়ে গেছে। কেউ গাছ থেকে পাতা ভাঙছেন, কেউ তা টঙঘরে রোদে শুকাচ্ছেন। আবার কেউ খেত থেকে পাতা তুলে মাথায় করে বাড়িতে নিচ্ছেন। এসব কাজে কৃষকদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের নারী সদস্যদেরও অংশ নিতে দেখা যায়।
চরনারায়ণপুর গ্রামের কৃষক মান্নান মণ্ডলের সঙ্গে কথা হয়। জানালেন, তিনি দুই বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছেন। তামাক চাষে কষ্ট বেশি, কিন্তু লাভও বেশি। অন্য কোনো ফসলে এত টাকা পাওয়া যায় না।
‘দুই বিঘা জমিতে এক লাখ টাকার বেশি লাভ হবে। কোম্পানি বীজ, সার ও নগদ টাকা দিয়েছে। পরে বিক্রির সময় তারা সেই টাকা কেটে নেবে।’ - যোগ করেন তিনি।
সুজন সরদার নামে আরেক কৃষক জানান, গত বছরের মতো এবারও তিনি দুই বিঘা জমিতে তামাক চাষ করেছেন। জমি ইজারা নিতে ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা।
‘কোম্পানি থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছি। বুট, হ্যান্ডগ্লাভসসহ নানা উপকরণ দিয়েছে। নগদ টাকাও দিয়েছে। এবার প্রতি কেজি শুকনো তামাক পাতা ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সব খরচ বাদ দিয়েও এক লাখ টাকার বেশি লাভ হবে।’
তবে তামাক একটি মাদকজাত ফসল হওয়ায় কৃষি বিভাগ এটি নিরুৎসাহিত করছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘তামাক চাষে আইনগত কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও আমরা কৃষকদের নিরুৎসাহিত করছি। উঠান বৈঠক, সভা-সেমিনারের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। তামাকের পরিবর্তে উচ্চমূল্যের অন্যান্য ফসল চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।’
‘বিভিন্ন কোম্পানির আর্থিক সহায়তায় কৃষকরা তামাক চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে।’ - আরও জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে তামাক চাষের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ধারণা করা হয়, ১৬শ শতকে পর্তুগিজদের মাধ্যমে উপমহাদেশে এর প্রচলন শুরু হয় এবং ব্রিটিশ আমলে বাণিজ্যিকভাবে বিস্তার লাভ করে। স্বাধীনতার পর বহুজাতিক কোম্পানির অংশগ্রহণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তামাক চাষ আরও বাড়ে।
তামাক চাষে বীজ, সার ও নগদ অগ্রিম সহায়তা দেওয়ায় প্রাথমিক পুঁজি ছাড়াই কৃষকরা এতে যুক্ত হচ্ছেন। তবে এতে তারা অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাক চাষ পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এতে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে মাটির উর্বরতা কমে, জ্বালানি কাঠের চাহিদায় বন উজাড় বাড়ে। পাশাপাশি তামাকের সংস্পর্শে কৃষকরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন এবং তামাকজাত পণ্য ক্যানসারসহ নানা রোগের কারণ হয়।

