৪০ প্রাণ বাঁচানো দুলালের পরিবারই বাঁচার যুদ্ধে

৩১ বছর বয়সী যুবক দুলাল। জীবনে বড় কোনো স্বপ্ন ছিল না, ছিল শুধু সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা। দূরপাল্লার বাসে হেলপারের কাজ করেই চলত তার দিন। কিন্তু সেই মানুষটিই একদিন এমন এক সিদ্ধান্ত নিলেন, যা তাকে সাধারণ একজন শ্রমিক থেকে মানুষের হৃদয়ে অসাধারণ এক জায়গায় পৌঁছে দিল— নিজের জীবন দিয়ে বাঁচালেন যাত্রীবোঝাই একটি বাসের ৪০ জনের প্রাণ।
ঈদের পরদিন শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার ধলেশ্বরী টোলপ্লাজায় ঘটে ভয়াবহ ঘটনাটি। আহসান পরিবহনের যাত্রীভর্তি বাসটি ঢাকা অভিমুখে যাওয়ার সময় হঠাৎ ব্রেক ফেল করে। চালক কোনোভাবেই বাসটির নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছিলেন না। ঠিক সে সময় বাসের ভেতর থাকা দুলাল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেমে পড়েন চলন্ত গাড়ি থেকে। শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি চাকার নিচে কাঠ বা ভারী কিছু দিয়ে বাসের গতি থামানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু নিয়তি তাকে আর সুযোগ দেয়নি। চলন্ত বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। দুলালের সেই শেষ চেষ্টার ফলেই নিয়ন্ত্রণে আসে বাসটি। ৪০ জনের মতো যাত্রীর কেউ আহত হননি। একমুহূর্তে ঘটে যায় এক অদ্ভুত ঘটনা— একজন মানুষ হারিয়ে গেলেন; কিন্তু বেঁচে গেল এতগুলো জীবন।
কিন্তু দুলালের নিজের জীবনের গল্প ছিল অনেক কঠিন। কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের কেজিপাড়ার বাসিন্দা দুলাল ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামের মধ্যে বড় হয়েছেন। মাত্র তিন মাস বয়সে মাকে হারান তিনি। পরে বাবার দ্বিতীয় সংসারে বড় হওয়ার জায়গা না পেয়ে আশ্রয় নেন বড় ভাই আমিনুর ইসলামের কাছে।
২০১৪ সালে বিয়ে করেন দুলাল। সংসার শুরু হলেও সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তাদের একটি সন্তান জন্মের কিছুদিন পর মারা যায়। এরপর থেকে দুলালের স্ত্রী মুসলিমাও দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে পড়েন।
দুলালের স্ত্রীর কথায় ফুটে ওঠে এক অসহায় জীবনের দীর্ঘশ্বাস। তিনি বলেছেন, ‘আমার পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল দুলাল। আমাদের সন্তান জন্মের পর মারা যায়। এরপর থেকেই আমি অসুস্থ। প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকার ওষুধ লাগে। এখন আমি কীভাবে চলব, জানি না।’
আহসান পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার নুর আলম দুলালের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। উত্তর ধরলা মটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বশির আহমেদ বাঁশিও দিলেন একই আশ্বাস।





