বর্ষা এলেই বাঘাইছড়ি-দীঘিনালা সড়ক মরণফাঁদ

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি-দীঘিনালা প্রধান সড়ক যেন মরণফাঁদ। ছবি: আগামীর সময়
বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই রাঙামাটির বাঘাইছড়ি-দীঘিনালা প্রধান সড়ক যেন পরিণত হয় মরণফাঁদে। টানা বৃষ্টিতে সড়কের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি, পিচ উঠে যাওয়া ও পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয় যাত্রী ও চালকদের। অতিবৃষ্টির সময় পাহাড়ধসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো দিনের পর দিন বন্ধ থাকা যান চলাচল। এতে বাঘাইছড়ির সঙ্গে দীঘিনালাসহ আশপাশের এলাকার যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
খাগড়াছড়ির সড়ক বিভাগ বলছে, মারিশ্যা-দীঘিনালা সড়কের পাঁচটি অংশ পাহাড়ধসের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সড়কটি মেরামত ও সংস্কারের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে একটি ডিপিপি। বাঘাইছড়ি উপজেলা রাঙামাটি জেলার মধ্যে হলেও সড়কটি খাগড়াছড়ি সড়ক বিভাগের আওতাধীন। সড়কপথে বাঘাইছড়ি থেকে খাগড়াছড়ি জেলা সদর ও দীঘিনালা উপজেলা হয়ে চলাচল করতে হয়।
বর্ষায় টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন স্থানে মাটি ধসে সড়কের ওপর পড়ে। কোথাও গাছ উপড়ে পড়ে সড়ক বন্ধ হয়ে যায়, আবার কোথাও পানির প্রবল স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়কের বিভিন্ন অংশ। বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের ভাষ্য, সাময়িক মেরামতের পর বর্ষার শুরুতেই ভারী বৃষ্টিতে আবারও সড়কের বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যায়।
সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে প্রতিবছর ছোট-বড় নানা ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটে। পিচ্ছিল রাস্তা, বড় গর্ত ও পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মোটরসাইকেল, সিএনজি, জিপসহ বিভিন্ন যানবাহন দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সিএনজি চালক শামীম বলেন, ‘বর্ষা এলেই এই সড়ক যেন হয়ে যায় মরণফাঁদ। রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্তের অভাব নাই, হুটহাট কখন না জানি কী হয়ে যায়। এই সড়কের স্থায়ী সংস্কার প্রয়োজন।’
পিকআপ চালক মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, বর্ষা শুরু হলেই বাঘাইছড়ি-দীঘিনালা সড়কে গাড়ি চালানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। কোথায় গর্ত, কোথায় রাস্তা ধসে গেছে, তা আগে থেকে বোঝা যায় না। যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে খুব ধীরে গাড়ি চালাতে হয়। এতে সময়ও বেশি লাগে।
রাঙামাটি সদরের উদ্দেশে যাওয়া যাত্রী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রয়োজনের তাগিদে প্রায়ই এই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু বর্ষাকালে প্রতিটি যাত্রাই যেন আতঙ্কের। মাঝেমধ্যে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে রাস্তা পার হতে হয়, আবার পাহাড়ধসের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতেও হয়। আমরা চাই, সরকার দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি নিরাপদ ও চলাচল উপযোগী করে তুলুক।’
বাঘাইছড়ি পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি ও শান্তি পরিবহনের লাইনম্যান গিয়াস উদ্দিন নাছিরের দাবি, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে প্রতিদিনই যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদেরও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে কাদা ও গর্তের সৃষ্টি হয়। ফলে অনেক সময় যানবাহন চলাচল করতে না পেরে যাত্রীদের গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে পথ অতিক্রম করতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কের এমন নাজুক অবস্থা যাত্রীদের মনে তৈরি করেছে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা। দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই এই সড়কে ভ্রমণ করতে উদ্বিগ্ন থাকেন। দ্রুত সড়কটির প্রয়োজনীয় সংস্কার ও টেকসই উন্নয়ন করা হলে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমবে, পরিবহন চলাচল স্বাভাবিক হবে এবং স্থানীয় জনগণসহ সংশ্লিষ্ট সবাই উপকৃত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর খাগড়াছড়ির উপসহকারী প্রকৌশলী প্রিয়দর্শী চাকমা বলেন, ‘বাঘাইছড়ির মারিশ্যা-দীঘিনালা সড়কটি পুরোটা ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে সড়কের পাঁচটি পয়েন্ট পাহাড়ধসের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ইতিমধ্যে সড়কটি মেরামত ও সংস্কারের জন্য একটি ডিপিপি প্রণয়ন করেছি আমরা। সেটি এখন সড়ক মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। সেখান থেকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে যাবে। যদি প্রকল্পটি পাস হয়, তাহলে রাস্তাটি ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব হবে এবং লোকজনের দুর্ভোগ কমবে।’
এলাকাবাসীর দাবি, বাঘাইছড়ি-দীঘিনালা প্রধান সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো দ্রুত স্থায়ীভাবে সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি কার্যকর পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের মতে, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রতি বর্ষায় এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি আবারও মানুষের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হবে।




