কুড়িগ্রাম
ছিন্নমূল মানুষের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে কোটি টাকা লেনদেন

ছবি: আগামীর সময়
ভিক্ষুক, হতদরিদ্র, ভিটেমাটিহীন মানুষের নামে ব্যাংক হিসাব খুলে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা লেনদেন করেছে একটি চক্র। ঘটনাটি ঘটেছে কুড়িগ্রামের পূবালী ব্যাংকের ঘোষপাড়া শাখায়। অথচ ভুক্তভোগীরা বলছেন, তারা কোনোদিন ব্যাংকেই যাননি। এমনকি তাদের অনেকে চেনেনও না ব্যাংকটির শাখা কোথায়।
ভুক্তভোগীদের ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। ভিন্নভাবে ওই প্রতারক চক্রের মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে এরই মধ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন আদালতে হয়েছে একটি মামলাও। মামলা চালাতে গিয়ে ভিটেমাটিহীন এসব মানুষ হচ্ছেন আরও নিঃস্ব।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা এ ঘটনায় হওয়া মামলা সম্পর্কে জানেন। কিন্তু কীভাবে ওই শাখায় ব্যাংক হিসাব খোলা হলো তারা সে বিষয়ে অবগত নন। এমনকি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন না হওয়া পর্যন্ত সে বিষয়ে তারা দেবেন না কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য।
প্রতিবেদকের হাতে আসা ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চলতি বছরের আগস্ট মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত ধরলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা নবরিন বেগমের নামে পূবালী ব্যাংকের ব্যাংক হিসাব থেকে লেনদেন হয়েছে ৯০ লাখ ২৪ হাজার ২৮২ টাকা। এসব টাকা লেনদেন হয়েছে অনলাইন ট্রানজেকশনের মাধ্যমে। তবে বেশির ভাগ লেনদেন এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বছর দেড়েক আগে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ধরলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে বিধবা ভাতা, নিরীহ ভাতা, সরকারি ঘর দেওয়ার কথা বলে একদল তরুণ আসেন এই আশ্রয়ণ প্রকল্পে। পরে তারা ভুক্তভোগীদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, আঙুলের ছাপ প্রভৃতি নেন। এরপর তারা কখনো আর আসেনিনি ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পে। জুলাই মাসের শুরুতে একদিন ভুক্তভোগীর বাড়িতে পুলিশ এলে তারা জানতে পারেন তাদের নামে জালিয়াতির মামলা হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছি ইউনিয়নের আশির বেশি বয়সী বিধবা নবিরন বেগমের নেই ভিটেমাটি। আর সম্পদ না থাকায় তিনি বসবাস করছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পে (ধরলা আবাসনে)। তা-ও ঘরটি তার নিজের নামে বরাদ্দ হয়নি। অন্যের ঘরে তিনি থাকছেন। গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করেই খেয়ে-না খেয়ে চলছে তার দিন। অথচ কুড়িগ্রাম পূবালী ব্যাংকে তার নামে অ্যাকাউন্ট খুলে প্রায় ৯০ লাখ টাকা লেনদেন করা হয়েছে। যার বিষয়ে কিছুই জানেন না তিনি।
ভুক্তভোগী নবিরন জানালেন, ভাতা, গরু-ছাগল দেওয়ার কথা বলে এনআইডি, ছবি তুলে নিয়ে যায় চক্রের সদস্যরা। এরপর তিনি আর কিছুই জানেন না। এখন তিনি পুলিশের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
এই অশ্রয়ণ প্রকল্পে শুধু নবিরন বেওয়া নন। তার মতো অবস্থা আহিনা বিবিরও। তার নামেও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে প্রায় ২৩ লাখ টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে চক্রটি। আহিনা বিবির দাবি, ভাতা করে দেওয়ার নাম করে দুজন তরুণ আবাসনে এসে মানুষের কাছে এনআইডি ও ছবি তুলে নিয়ে যায়। এরপর কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম থেকে ২৩ লাখ টাকা আত্মসাতের একটি নোটিস আসে। অথচ তিনি পূবালী ব্যাংকে না গেলেও কীভাবে এসব টাকা লেনদেন হয়েছে কিংবা কারা করেছে তিনি জানেন না।
এর আগে গত বছর রাজবাড়ীতে এক ইমামের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একই আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দা বৃদ্ধ আনছার আলী ২ লাখ ৫০ হাজার টাকার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে এক সপ্তাহ জেল খাটেন। এ বিষয়ে সংবাদ প্রচারের পর পূবালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ টাকা পরিশোধ করে বৃদ্ধার বিরুদ্ধে মামলাটি সমাধান করে দেয়। এবার তার স্ত্রী ফরিদা বেগমের নামে খোলা হয়েছে আরেকটি ব্যাংক হিসাব।
জানতে চাইলে ফরিদা বেগম জানালেন, ‘কে জানে কখন কোন মামলায় ফাঁসি যাই। একবার তো হইরাইন হইলাম। আমার স্বামী জেল খাটিল। আর আমরা হইরাইন হবার চাই না। আমরা এগলা থাকি মুক্তি চাই।’
অন্যের বাসায় কাজ করে খান শেফালী বেগম। তার নামেও একই শাখায় ব্যাংক হিসাব খুলে লেনদেন করা হয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। তিনিও এ বিষয়ে জানে না কিছু।
তিনি প্রতিবেদকে জানালেন, আমি মানুষের বাসায় কাজ করে খাই। আমি ব্যাংকে গেছিলাম, কেউ আমাদের বিচার নেয় না, কথা শোনে না। আমরা এখন কোথায় যাব। বরং ব্যাংকের লোকেই বলে আপনার তো কম টাকা। আপনি কিছু দেন সমাধান হবে।’
স্থানীয়দের দাবি এই আবাসনে প্রায় দেড় শতাধিক পরিবারের বসবাস। এসব অধিকাংশ পরিবারের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করছে সিন্ডিকেট চক্রটি। ফলে দরিদ্র পরিবার মামলার ভয়ে এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সঠিক তদন্ত করে সিন্ডিকেট চক্র শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি স্থানীয়দের।
এ ধরনের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রতারণার করে খুলে হুন্ডি, ক্যাসিনো, মাদক, চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন কুড়িগ্রামের জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী ফারুক হোসেন সেতু।
তিনি জানালেন, প্রতারণা ও জালিয়াতি মামলায় বিভিন্ন ধারায় মাধ্যমে অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব। আমাদের প্রত্যাশা, ভুক্তভোগীরা ন্যায় বিচার পাক। প্রকৃত অপরাধীরা শাস্তির আওতায় আসুক।
এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে নারাজ পূবালী ব্যাংক কুড়িগ্রাম শাখার ম্যানেজার এ এইচ এম আলমগীর কবির।
তবে তিনি জানান, এ নিয়ে আদালতে দুটি মামলা হয়েছে। সিআইডি তা তদন্ত করছে।





