মহাসংকটে সুন্দরবনের সুন্দরী

টপ ডাইং বা আগা মরা রোগের পর এবার নতুন করে আরও একটি বিপদের মুখে পড়েছে সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী গাছ, ছবি: মহিদুল ইসলাম
টপ ডাইং বা আগা মরা রোগের পর এবার নতুন করে আরও একটি বিপদের মুখে পড়েছে সুন্দরবনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী গাছ। নতুন এই বিপদের নাম পরগাছা। আগে পরগাছা কেবল গাছের শাখা-প্রশাখায় সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন তা সুন্দরী গাছের মূল অংশে বিস্তার ঘটছে। ফলে দ্রুত দুর্বল হয়ে মারা যাচ্ছে গাছ। গত কয়েক বছর ধরে এই পরগাছার উপদ্রব অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় সুন্দরী গাছ চরম হুমকির মুখে পড়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বনবিভাগ ও বিশেষজ্ঞ মহল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুন্দরবন। বিশেষ করে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বেড়েই চলেছে সুন্দরী গাছের আগার মরা রোগ (টপ ডাইং) এবং পরগাছার বিস্তার। এই পরজীবী নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী এক-দুই দশকের মধ্যে সুন্দরী গাছ বিলুপ্ত উদ্ভিদের তালিকায় চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে বনের জীববৈচিত্র্য যেমন হুমকিতে পড়বে, তেমনি জীবন-জীবিকা হারানোসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকবেলা করে টিকে থাকাও মুশকিল হয়ে পড়বে উপকূলবাসীর জন্য। পরগাছা নিয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো গবেষণা না হওয়ায় এই উপদ্রব থেকে পরিত্রাণের উপায়ও ঠিক করতে পারছে না বনবিভাগ।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে বিস্তৃত পৃথিবীর বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বন। এই বন শুধু পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভই নয়, এটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যেরও অংশ। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এই বন প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি এটি দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অন্যতম ভূমিকা রাখছে যুগ যুগ ধরে। আর এই বনের নামকরণও হয়েছে ‘সুন্দরী’ গাছের নামে। একসময় গোটা সুন্দরবনের বেশিরভাগ জায়গাজুড়ে ছিল সুন্দরী গাছের রাজত্ব। কিন্তু সেই সুন্দরী গাছের জন্য এখন মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে পরগাছা নামের এই পরজীবী উদ্ভিদ।
সুন্দরী গাছ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। এ ছাড়া সুন্দরী গাছ প্রকৃতিগতভাবেই অন্যসব গাছের তুলনায় শক্তপোক্ত। এর শেকড় মাটির ক্ষয়রোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এই সুন্দরী গাছ ও সুন্দরবন প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস ও লবণাক্ততা থেকে রক্ষা করে উপকূলকে। এ ছাড়া সুন্দরীর শেকড় ও ঝরা পাতা নানা প্রজাতির মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণির প্রজননের জন্য আশ্রয় ও পরিবেশ তৈরী করে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা এবং চাঁদপাই রেঞ্জের বন ও লোকালয়ের ভেতর থেকে বয়ে যাওয়া এক সময়ের খরস্রোতা ভোলা নদী ভরাট হয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে। শরণখোলা রেঞ্জের দাসের ভারাণী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ি থেকে চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলী টহল ফাঁড়ি, ধানসাগর স্টেশন, জিউধরা স্টেশন, কদলমতেজী টহল ফাঁড়ি হয়ে জয়মনী পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার নদী ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে এই নদীর নাম এখন মারা ভোলা নামে পরিচিত। ভোলা নদী ভরাট হওয়ার ফলে বনের অভ্যন্তরে প্রবাহিত শাখা খালগুলোও মরে যাচ্ছে। পানির স্বাভাবিক গতি কমে গেছে। এর ফলে পূর্ব বনবিভাগের এই অঞ্চলে সুন্দরীসহ ম্যানগ্রোভ প্রজাতির অন্যান্য উদ্ভিদের সংখ্যাও কমেছে গেছে আশঙ্কাজনকহারে। যার কারণে সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ ও পরগাছার আক্রমণ আরো ভরাবহ আকার ধারণ করেছে।
বনবিভাগের তথ্যমতে, সুন্দরবনের মোট আয়তন (বাংলাদেশ ও ভারত) প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬ হাজার ৫১৭ বর্গ কোলোমিটার যা মোট বনের ৬৬ শতাংশ। এটি খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত। সুন্দরবনে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে, যার মধ্যে ৩৫টি প্রকৃত ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদ। এ ছাড়া ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল, ১৩ প্রজাতির অর্কিড, ২৮ প্রজাতির ঘাস (নলখাগড়া, ছন ইত্যাদি) এবং ৯ প্রজাতির ছত্রাক। রয়েছে ৪৫৩ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা না গেলেও সুন্দরবেন জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী, খাল, খাড়ি ও বিল। এসব জলাভূমিতে ৩০০ প্রজাতির মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়িসহ কয়েক প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জরিপে সুন্দরবনে ১৮৪ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায়। এই জরিপে এককভাবে সুন্দরী গাছের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। তবে সুন্দরী, গেওয়া, গরাণ এই তিন প্রজাতি মিলিয়ে মোট ৭০ শতাংশের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
বনবিভাগ সূত্রে আরো জানা যায়, সুন্দরবন থেকে সরাসরি জীবিকা নির্বাহ করে ১০ লক্ষাধিক মানুষ। বিশাল এই জনগোষ্ঠী বনে মাছ ও কাঁকড়া ধরা, মধু ও মোম আহরণ, ছন, নল ও গোলপাতা কাটাসহ নানা ধরনের বনজ সম্পদ সংগ্রহের মাধ্যমে তাদের জীবনধারণ করে থাকে। পাশপাশি সুন্দরবন কেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসাতেও সম্পৃক্ত এ অঞ্চলের বহু মানুষ।
পরগাছার আক্রমণের ধরণ ও পরিমাণ
বনবিভাগের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে সুন্দরবনে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছ পরগাছায় আক্রান্ত। এই পরগাছা এক ধরনের পরজীবী উদ্ভিদ। যা সুন্দরীর মূল গাছ থেকে শুরু করে ডালপালাকে আকড়ে বেড়ে ওঠে। এই পরজীবী গাছের রস শোষণ করে বেঁচে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে পাতা হলুদ বর্ণ ধারণ করে ঝরে পড়ে। একসময় গাছটিও শুঁকিয়ে মারা যায়।
বহুমুখী সংকট
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সুন্দরবনের জন্য এখন বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। পানিতেও লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে অতিমাত্রায়। দুর্যোগের সময় অস্বাভাবিক জলোচ্ছাসে বার বার প্লাবিত হয়ে লবণাক্ত পানির সঙ্গে পলি জমছে সুন্দরবনের উপরিভাগে। এর ফলে নানা প্রজাতির পরগাছা, লতাগুল্ম ও ছত্রাকের জন্ম হচ্ছে। আর এসব আগাছার বেশিরভাগই বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দীরকে আক্রমণ করছে। এ ছাড়া বনের অভ্যন্তর ও পাশ থেকে বহমান নদ-নদীগুলো ভরাট হচ্ছে দিন দিন। বনের তুলনামূলক উচু এলাকায় মিষ্টি পানি প্রবেশ করতে পারছে না। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কারণে সুন্দরী গাছে পরগাছা, ছত্রাক ও কীটপতঙ্গের আক্রমণ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আরো দুর্বল করে তুলছে সুন্দরীর অস্তিত্বকে।
জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব
সুন্দরী গাছ কমে গেলে গোটা ইকোসিস্টেমে ভেঙে পড়বে। সুন্দরী গাছের গোড়ার শেকড়ে আশ্রয় নেয় নানা প্রজাতির মাছ ও চিংড়ি। গাছে আশ্রয় নেয় বানর এবং গাছের শাখা-প্রশাখায় বাসা বাঁধে নানাজাতের পাখপাখালী। বাঘ, হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থল এই সুন্দরী গাছ। বনের হরিণ ও অন্যসব বন্যপ্রাণী আবার সেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান খাদ্য। তাই সুন্দরী গাছ কমে গেলে বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিরূপ প্রভাব পড়বে স্থানীয় মানুষের জীবিকায়
সুন্দরবনের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল ১০ লক্ষাধিক মানুষ। এই বনই তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। সুন্দরবনের মাছ, মধু ও শুঁটকির চাহিদা ও সুনাম রয়েছে দেশ-বিদেশে। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে অনেকটাই ভূমিকা রয়েছে এই বনজ ও জলজ সম্পদের। তাছাড়া এসব সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার করে নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে উপকূলে। ফলে সুন্দরী গাছ কমে গেলে শুধু জীববৈচিত্র্যে নয়, অস্তিত্ব সংকটে পড়বে গোটা সুন্দরবন। মানুষের জীবন-জীবিকাও পড়বে হুমকির মুখে।
সুন্দরবনের পেশাজীবীদের কথা
শরণখোলা উপজেলার বনসংলগ্ন খুড়িয়াখালী গ্রামের মৌয়াল মো. শাহজাহান আকন (৬০) ও মো. আউয়াল খাঁন (৫৫) বললেন, ৩০-৩৫ বছর ধইরা সুন্দরবনে মধু আহরণ করি। সুন্দরবনের সব জায়গা আমাগো চেনা। এহন আর আগে মতো মধু পাই না। কারণ বনের অনেক জায়গায় সুন্দরী গাছ নাই। ৫-৬ বছর আগেও যে সব জায়গায় ঘন জঙ্গল ছিলো সেসব জায়গা এহন ফাঁকা। বহু সুন্দরী গাছ শুকাইয়া গেছে। আর মরা গাছে মৌমাছি চাক বান্দে না। এহন ৪-৫ কিলোমিটার হাঁটার পরও একটা মৌচাকের দেহা পাই না।
খুড়িয়াখালী গ্রামের জেলে মো. আশরাফ আলী ফরাজী (৭০) ও মো. রুস্তম গোলদারের (৬০) ভাষ্য, ছোটবেলা থেইকাই সুন্দরবনে মাছ ধরি। আগে যে মাছ পাইতাম তা এহন আর পাই না। অনেক মাছের তো দেহাই (দেখা) পাই না। যেমন চিত্রা, শিলন ট্যাংরা, ডগরি মাছ নাই বললেই চলে। এই মাছ খাইতে অনেক সুস্বাদু। এইসব মাছ সুন্দরবনের ছোট খালে বেশি পাওয়া যাইত। কিন্তু বনের আগের পরিবেশ নাই।
উদ্যোক্তাদের কথা
সুন্দরবনের জলজ ও বনজ সম্পদকে কেন্দ্র করে বনসংলগ্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে নতুন নতুন অনেক উদ্যোক্তার। এদের মধ্যে কথা হয় শরণখোলার রাসেল আহমেদ ও সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকার হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তারা সুন্দরবনের মাছ ও মধু অনলআইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পার্সেল করে থাকেন। এ ছাড়া তারা গোলপাতার রসের গুঁড় ও কেওড়ার আচার তৈরি করে সেগুলোও বিক্রি করছেন। অর্গানিক এসব পণ্য হাতে পেয়ে গ্রাহকরাও অনেক খুশি। চাহিদাও বাড়ছে দিন দিন। বর্তমানে প্রতিমাসে এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা সেল হচ্ছে তাদের। পাশাপাশি সুন্দরবেন ট্যুরিস্ট ব্যবসাও রয়েছে তাদের। সেই সুবাদে বনে তাদের যাওয়া-আসা রয়েছে। তারাও দেখেছেন বনের অসংখ্য সুন্দরী গাছ পরগাছার আক্রমণের শিকার হয়েছে। মৃত গাছগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে। এভাবে সুন্দরী গাছ মরলে সামগ্রিক ক্ষতির মুখে পড়বে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষ। এমনটাই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই উদ্যোক্তরা।
বিশেষজ্ঞরা জানালেন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্টি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলাম বললেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের নানা পরিবর্তন পরিলক্ষতি হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে লবণাক্ততা বৃদ্ধি। এই লবণাক্তার কারণে বনের জীববৈচিত্র্যের বেশ ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ ও পরগাছার আক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে গাছের বিন্যাস ও গঠনে পরিবর্তন আসছে। সুন্দরী বা ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ কমে গেলে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের বিষয়ে জানতে চাইলে ড. ওয়াসিউল ইসলাম বললেন, সুন্দরবনে প্ল্যান্টেশনের সুযোগ নেই। বনের যেসব জায়গার গাছ মরে ফাঁকা হচ্ছে, সেসব স্থানে প্রাকৃতিকভাবেই অন্য কোনো গাছ দখল করছে। তবে, যে কারণেই হোক সুন্দরী গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে কমতে থাকলে একসময় সুন্দরবনের অস্তিত্ব, বনের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও উপকূলের জীবন-জীবিকা চরম হুমকিতে পড়বে। সুন্দরী গাছের পরগাছা ও মড়করোধে ব্যাপক গবেষণা ছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত বা মতামত দেওয়া সম্ভব নয়।
মৎস্য গবেষকের ভাষ্য
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা উনস্টিটিউট খুলনার লোনাপানি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. লতিফুল ইসলামের মতে, সুন্দরবনে আগের মতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। বন থেকে ফিরে আসা অসংখ্য জেলের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। বনের অভ্যন্তরে অনেক নদী-খালে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। যে কারণে মাছের বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। ফলে জেলেরাও আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না।
এই গবেষকের মতে, সুন্দরবনে এককভাবে কোনো মাছের প্রজাতি বিলুপ্ত বা কমে গেছে তা কিন্তু নয়, সামগ্রিকভাবেই কমছে মাছের সংখ্যা। আর শুধু যে সুন্দরী গাছ মারা যাওয়ার কারণে মাছের পরিমাণ কমছে এমনটাও নয়, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং অতিমাত্রায় মৎস্য আহরণও মাছ কমে যাওয়ার একটি বড় কারণ। ফলে এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে জেলেদের ওপর। সুন্দরবনে অন্যান্য পেশার মানুষের তুলনায় জেলের সংখ্যা বেশি। তাই পর্যাপ্ত মাছ না পেলে একসময় বিশাল এই জেলে সম্প্রদায়ের জীবিকা হারানোর শঙ্কা রয়েছে।
বনবিভাগের মন্তব্য
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেছেন, আগে থেকেই সুন্দরী গাছের টপ ডাইং (আগা মরা) রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। আবার নতুন করে আরো বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে পরগাছার উপদ্রব। সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরী গাছে পরগাছার আক্রমণ। অসংখ্য গাছ মরে দাঁড়িয়ে আছে। এই পরগাছা এখন সুন্দরবন বিভাগের জন্য বড় উদ্বেগের কারন। সুন্দরী গাছ রক্ষায় এই পরজীবী নিয়ে দ্রুত গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভরাট হওয়া ভোলা নদী খননের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএফও রেজাউল করিম চৌধুরী বললেন, সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে ভোলা নদীর ভরাট হওয়া ১৬ কিলোমিটারের মধ্যে এক কিলোমিটারের মতো খনন করা হয়েছে। বর্তমানে কাজ স্থগিত। পরবর্তীতে বাকি অংশ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। ভোলা নদী খনন হলে বনের বিশাল একটি অংশে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পাবে। সজীবতা ফিরে পাবে সুন্দরবন।





