ঠাকুরগাঁও মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র
‘এখানে সিজার হয় না’

সংগৃহীত ছবি
গর্ভধারণের শুরু থেকেই ঠাকুরগাঁও মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসা নিয়েছেন রেশমা আক্তার। চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে তার আশা ছিল, সরকারি এ প্রতিষ্ঠানেই জন্ম হবে সন্তানের। কিন্তু প্রসববেদনা নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর তার সে আশা গুঁড়িয়ে যায় মুহূর্তেই।
চিকিৎসক জানালেন— স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব নয়, জরুরি সিজারিয়ান করতে হবে। কিন্তু অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় চার মাস ধরে এই কেন্দ্রে সিজারিয়ান কার্যক্রম বন্ধ। তাই তাকে (রেশমা) যেতে হবে অন্য হাসপাতালে। কথাটি শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তার স্বামী একটি দোকানের কর্মচারী। সীমিত আয়ের সংসারে বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ানের ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে রেশমা বললেন, ‘গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি। ভেবেছিলাম এখানেই সন্তান হবে। এখন বলছে সিজার হয় না, বাইরে যেতে হবে। এখানে যদি সিজারের ব্যবস্থা থাকত, তাহলে অন্য হাসপাতালে যেতে হতো না। আমাদের এত টাকা খরচ করার সামর্থ্য নেই।’
রেশমার মতো এমন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন অনেক অন্তঃসত্ত্বা। অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে গত ফেব্রুয়ারি থেকে ঠাকুরগাঁও মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে সিজারিয়ান কার্যক্রম। ফলে যেসব প্রসূতির স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব হয় না, তাদের পাঠানো হচ্ছে অন্য হাসপাতালে।
সরেজমিন দেখা যায়, একসময় রোগীর ভিড়ে ব্যস্ত থাকা কেন্দ্রটির ওয়ার্ডগুলো এখন অনেকটাই ফাঁকা। অপারেশন থিয়েটারেও নেই কোনো কর্মব্যস্ততা। সিজার বন্ধ থাকায় দিন দিন কমছে রোগীর সংখ্যা। অনেক অন্তঃসত্ত্বা শুরুতেই অন্য হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন।
রেশমার স্বামী বললেন, ‘সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা হবে ভেবেছিলাম; কিন্তু এখন বাইরে যেতে বলা হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালে সিজার করতে অনেক টাকা লাগে। আমাদের মতো মানুষের জন্য এটা খুবই কষ্টের।’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন সদর উপজেলার বাসিন্দা সুরাইয়া বেগম। তিনি বলেছেন, ‘সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা পাব বলে এখানে এসেছিলাম। কিন্তু সিজার হয় না বলে অন্য হাসপাতালে যেতে বলেছে। গরিব মানুষের জন্য বাইরে গিয়ে চিকিৎসা করানো অনেক কষ্টের।’
রোগীর স্বজন আহাদুল হোসেন বলেছেন, ‘নরমাল ডেলিভারি সম্ভব না হলেই রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জরুরি সময়ে রোগী নিয়ে ছুটতে হয়, আবার অতিরিক্ত টাকাও খরচ হয়।’
শুধু সিজারিয়ান সেবাই নয়, চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটও রয়েছে কেন্দ্রটিতে। প্রয়োজনীয় ডেলিভারি কিট পর্যাপ্ত না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে সেবা কার্যক্রম। এ ছাড়া কেন্দ্রটির একমাত্র অ্যাম্বুলেন্স অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।
ঠাকুরগাঁও মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. লাবণী বসাক বললেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাসে আমাদের অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অবসরে গেছেন। অবসরের পরও এক মাস তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এরপর থেকে তিনি আর আসছেন না। সে কারণেই সিজারিয়ান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। যেসব মায়ের সিজার প্রয়োজন হচ্ছে, তাদের অন্য হাসপাতালে রেফার করতে হচ্ছে।’
অ্যাম্বুলেন্স প্রসঙ্গে ডা. লাবণী বসাক বললেন, ‘দুই বছর ধরে জ্বালানির জন্য কোনো বাজেট পাওয়া যাচ্ছে না। পেট্রল পাম্পের কাছে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা বকেয়া। তাই জ্বালানি সরবরাহও বন্ধ রয়েছে।’
চিকিৎসাসামগ্রীর বিষয়ে ডা. লাবণী বসাক জানালেন, প্রতি মাসে ১০-১২টি ডেলিভারি কিট প্রয়োজন হলেও জানুয়ারিতে পাওয়া গেছে আটটি এবং ফেব্রুয়ারিতে মাত্র দুটি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একজন অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞের অভাবে জেলার গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি মাতৃসেবা প্রতিষ্ঠানের সিজারিয়ান কার্যক্রম মাসের পর মাস বন্ধ থাকলেও তা চালুর কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের অন্তঃসত্ত্বারা। তাদের দাবি, দ্রুত অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ এবং অ্যাম্বুলেন্স সচল করে মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু করা হোক।




