সেতু আছে সড়ক নেই, ২১ বছর ধরে ঝুলছে ৫০ হাজার মানুষের ভাগ্য

কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ডাকাতিয়া নদীর ওপর ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে একটি কংক্রিটের সেতু। ঝলম ও হাওরা এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে নির্মিত এই ‘হাওরা সেতু’ পার হয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করতে পারতেন দুই পাড়ের অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্মাণের প্রায় ২১ বছর পার হতে চললেও আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি সেতুর সংযোগ সড়ক। ফলে দুই পাড়ের মানুষের আজীবনের দুর্ভোগ দূর করার বদলে এই সেতু এখন নিজেই এক বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে এলজিইডির তত্ত্বাবধানে এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) অর্থায়নে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে এই সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ২০০৫ সালের ৫ জানুয়ারি তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এর পরের বছর, ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর তিনি এর উদ্বোধনও করেন। তবে উদ্বোধনের সেই জমকালো আয়োজনের পর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়, কিন্তু সংযোগ সড়কের অভাবে সেতুটি আজ পর্যন্ত জনগণের কোনো কাজেই লাগেনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আক্ষেপ, সংযোগ সড়ক ছাড়া এই সেতু নির্মাণ করায় তাদের ভোগান্তি আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। সেতুটি হওয়ার আগে এখানে একটি বাঁশের সাঁকো ছিল, যা দিয়ে হেঁটে অন্তত দ্রুত পার হওয়া যেত। কিন্তু এখন উঁচু সেতুটি দাঁড়িয়ে থাকলেও এর দুই পাশে কোনো মাটি নেই। ফলে খাড়া সেতুটিতে ওঠানামা করা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অথচ ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে এই সেতুটির গুরুত্ব অপরিসীম। সেতুর পশ্চিম পাড়েই রয়েছে হাওরা মাদরাসা ও এতিমখানা এবং মাত্র ২৫০ গজের মধ্যে মনোহরগঞ্জ থানা। অন্যদিকে পূর্ব-দক্ষিণ পাড়ে রয়েছে মনোহরগঞ্জ উপজেলার প্রধান প্রশাসনিক ভবন, মনোহরগঞ্জ বাজার, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংক-বিমাসহ অসংখ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। মনোহরগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিদিন মালামাল নিয়ে এই খাড়া সেতুর ওপর দিয়ে যাতায়াত করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টের। এখানে একটি সংযোগ সড়ক হলে নদীর দুই পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রা পুরোপুরি বদলে যেত।
এলাকাবাসীর অভিযোগ আরও গুরুতর। তারা জানান, সেতুর দুই পাশের মাটি ভরাটের জন্য প্রায় প্রতি বছরই কাগজে-কলমে প্রকল্প পাস হয়। কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ না করেই ঠিকাদাররা বিল তুলে নিয়ে চলে যান।
যোগাযোগ করা হলে মনোহরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী শাহ আলম সংকটের কথা স্বীকার করে বললেন, 'এই সংযোগ সড়কটিসহ মনোহরগঞ্জের ৪টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের কাজ ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ‘ম্যাক্স’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা কাজ শুরু করেও মাঝপথে ফেলে চলে যাওয়ায় সমস্যাটি রয়েই গেছে। বিষয়টি বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সেখান থেকে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত এলেই কাজ শুরু করা হবে।'
এই দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের বিষয়ে মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গাজালা পারভিন রুহি জানান, তিনি পুরো বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত হয়েছেন এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশনা দিচ্ছেন।
২১ বছর ধরে স্রেফ এক টুকরো সংযোগ সড়কের অভাবে একটি পুরো অঞ্চলের ৫০ হাজার মানুষের চলাচল এভাবে থমকে থাকবে কি না, এখন সেটাই বড় প্রশ্ন।






