বটির ধারেই জীবিকার লড়াই টঙ্গীর ৫০ শ্রমিকের

টঙ্গীর শফিউদ্দিন বাজারে মাছ কাটার কাজে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। ছবি: আগামীর সময়
বটি আর ছুরি হাতে প্রতিদিন অর্ধশত শ্রমিক মাছ কাটেন গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী চেরাগআলী এলাকার শফিউদ্দিন সরকার বাজার মার্কেটে। মাছ কেটেই চলছে তাদের সংসার। বাজার কর্তৃপক্ষকে দৈনিক ১৬০ টাকা ফি দিয়ে নির্ধারিত স্থানে বসেন তারা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাছ কাটাই তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
আজ শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের পর থেকেই বাজারে বাড়তে থাকে ক্রেতাদের ভিড়। মাছ কিনে অনেকে সেখানেই কাটিয়ে নিচ্ছেন। মাছের ধরন ও আকার অনুযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে দর-কষাকষি করে ঠিক হচ্ছে কাটার মজুরি।
কেউ বড় মাছ কাটছেন, কেউ ছোট মাছ পরিষ্কার করছেন। কেউ আঁশ ছাড়াচ্ছেন, আবার কেউ কেটে মাছের টুকরো করে দিচ্ছেন। ব্যস্ততার মধ্যেই কেউ কেউ সেরে নিচ্ছেন সকালের নাশতা। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, মাছ কাটার যেন এক ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ চলছে।
বাজারে প্রায় পাঁচ বছর ধরে মাছ কাটার কাজ করছেন জাহিদ। তিনি জানান, মাছের ধরন অনুযায়ী কাটার মজুরি আলাদা। ছোট মাছ প্রতি কেজি ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং বড় মাছ কেজিপ্রতি ২০ টাকা দরে কাটা হয়।
জাহিদ জানান, সপ্তাহের অন্যান্য দিনে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আয় হয়। তবে শুক্র ও শনিবার ক্রেতার চাপ বেশি থাকায় আয় বেড়ে প্রায় ২ হাজার টাকা হয়। এই আয় দিয়েই নিজের ও পরিবারের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন তিনি।
জাহিদের মতো কামাল, মতিউরসহ প্রায় ৫০ জন শ্রমিক প্রতিদিন এই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
টঙ্গীর নিয়মিত ক্রেতা ও সরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানালেন, মাসের বাজার একসঙ্গে করায় অনেক সময় মাছের পরিমাণ বেশি হয়। বাড়িতে নিয়ে মাছ কাটার ঝামেলা এড়াতে তিনি বাজার থেকেই মাছ পরিষ্কার ও কাটিয়ে নেন।
তিনি বললেন, ‘বর্তমান সময়ে গৃহকর্মী পাওয়া কঠিন। তাই এই শ্রমিকরা আমাদের বড় দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছেন।’
একই সুবিধার কথা জানিয়েছেন টঙ্গীর দত্তপাড়া এলাকার গৃহিণী আসমা বেগম। স্বামী চাকরিসূত্রে চট্টগ্রামে থাকায় সংসারের বাজার তাকে একাই করতে হয়। বাজার থেকেই মাছ কাটিয়ে নেওয়ায় তার মতো কর্মব্যস্ত মানুষদের জন্য বিষয়টি বেশ স্বস্তির।
এই বাজারের সবচেয়ে বয়স্ক মাছ কাটার শ্রমিক আব্দুর রশিদ। বয়স ৬৫ বছর। তিনি বললেন, ‘হালাল উপার্জনের চেয়ে শান্তির কিছু নেই। এক বেলা মাছ কাটি, অন্য বেলা অন্য কাজ করে সংসার চালাই।’
গর্বের সঙ্গে আব্দুর রশিদ জানান, এই হালাল আয়ের টাকায় তিনি দুই সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করেছেন। বড় ছেলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ইন্টারভিউ দিয়েছেন। ছোট মেয়ে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন।
বয়সের ভারে একদিন হয়তো এই পেশা ছাড়তে হবে আব্দুর রশিদকে। তবে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হয়ে থাকা এই বাজারের স্মৃতি তিনি শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখবেন।




