রস দেবে না ১ লাখ ৭০ হাজার খেজুরগাছ!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিশিরভেজা স্নিগ্ধ সকাল। কুয়াশার বুক চিরে রক্তিম সূর্যের উঁকিঝুঁকি—প্রকৃতির এই রূপই দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। কেউ খেজুরগাছের ডালপালা ছাঁটছেন, কেউ দিচ্ছেন চাঁচা, আবার কেউ আগাম রস সংগ্রহের জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করছেন গাছ। গ্রামবাংলার হাজার বছরের চিরচেনা এই রূপ মনের খোরাক জোগালেও, আড়ালে রয়ে গেছে এক বড় আক্ষেপ। দক্ষ গাছির অভাব এবং নানা সংকট ও প্রতিকূলতায় উপজেলার প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রতি মৌসুমে হাতছাড়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
দেড়-দুই দশক আগেও যেখানে রস, গুড়ের মৌসুম শুরু হলে উপজেলার প্রতিটি বাড়ি থেকে ভেসে আসত রস ও গুড়ের ম-ম গন্ধ। সকাল-সন্ধ্যায় প্রতিটি বাড়িতে রস জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হতো গুড়। তৈরি হতো নানা রকম পিঠা-পায়েস। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সে দৃশ্যগুলো গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। গাছি পেশায় নতুন প্রজন্মের আগ্রহ নেই। অযত্ন-অবহেলা ও ইটভাটায় পুড়িয়ে নষ্ট হয়ে গেছে এলাকার হাজারো গাছ। সময়ের পরিবর্তনে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুরগাছ দিন দিন কমে যাচ্ছে। একসময় গ্রামের পতিত জমি, ক্ষেতের আল, ঝোপঝাড়ের পাশে এবং রাস্তার দুই ধারে অসংখ্য খেজুরগাছ দেখা যেত। এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন অনেক গাছি। কিন্তু বর্তমানে নতুন করে খেজুরগাছ লাগানো ও পরিচর্যার আগ্রহ কমে যাওয়ায় ঐতিহ্যটি হুমকির মুখে পড়েছে।
বর্তমান যে পরিমাণ খেজুরগাছ আছে, সেগুলোর ডালপালা ছেঁটে রসের জন্য প্রস্তুত করার মতো পর্যাপ্ত গাছি নেই। ফলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপজেলাবাসী।
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চৌগাছায় খেজুরগাছের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ। এর মধ্যে এ মৌসুমে ৩০ হাজার গাছ রসের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। গাছি সংকট ও নানা প্রতিকূলতার কারণে ১ লাখ ৭০ হাজার গাছ রস সংগ্রহের জন্য প্রস্তুত করা যাচ্ছে না।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, একটি পূর্ণবয়স্ক খেজুরগাছ থেকে প্রতি মৌসুমে গড়ে ৮০ লিটার রস পাওয়া যায়, যা থেকে প্রায় ১০ কেজি গুড় উৎপাদন সম্ভব। সে হিসাবে চৌগাছায় ৩০ হাজার গাছ থেকে প্রতি মৌসুমে প্রায় ৯ কোটি টাকার খেজুরের গুড় উৎপাদিত হয়। কৃষিসংশ্লিষ্টদের মতে, উপজেলার প্রায় ২ লাখ গাছই রসের জন্য প্রস্তুত করা গেলে প্রতি মৌসুমে শুধু চৌগাছা থেকেই প্রায় ৬০ কোটি টাকার খেজুরের গুড় উৎপাদন করা সম্ভব হতো। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ ও গাছি সংকটের কারণে প্রতি মৌসুমে প্রায় ৫১ কোটি টাকার গুড় উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপজেলাবাসী।
উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের শিমুল হোসেন, নারায়ণপুরের আলম, ভাদড়ার মামুন কবির পানু, বাড়ীয়ালীর বদর উদ্দীন জানালেন, তাদের বাড়িতে অনেক খেজুরগাছ রয়েছে। এখন টাকা দিয়েও অভিজ্ঞ গাছি পাওয়া যাচ্ছে না। দু-একজন গাছি মিললেও তাদের চাহিদা অনেক বেশি। যার কারণে এলাকার হাজার হাজার খেজুরগাছ রসের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হয় না।
গাছিরা বলছেন, গাছ ছাঁটাই করা, নালি টানা এবং হাঁড়ি বাঁধার কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিশ্রমের। সারা দিন কাজের তুলনায় রস বিক্রি করে কাঙ্ক্ষিত লাভ থাকে না। পুরনো অভিজ্ঞ গাছিদের বয়স বেড়ে যাওয়া ও নতুন গাছি তৈরি না হওয়ায় দিন দিন এই সংকট বাড়ছে।
চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইন বললেন, ‘গাছির তীব্র সংকটের কারণে উপজেলার ১ লাখ ৭০ হাজার গাছ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। আমরা গাছিদের প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা ও নানা সরঞ্জাম দেওয়ার মাধ্যমে এই সংকট উত্তরণের চেষ্টা করছি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ইসলাম জানিয়েছেন, খেজুরগাছ, রস ও গুড়ের ঐতিহ্য রক্ষায় উপজেলার বিভিন্ন সড়কের দুই পাশে খেজুরগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। এ ছাড়া গাছিদের প্রশিক্ষণ ও সমাবেশের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব গাছি বংশপরম্পরায় এই পেশা ধরে রেখেছেন, তাদের অনুদান দেওয়ার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।



