১৮৭ জনের পকেটে বরিশালের বালুর টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরিশাল নগরীতে পুকুর-জলাশয় ভরাটের হিড়িক পড়েছে। নগরীর কাউনিয়া এলাকায় একটি প্রভাবশালী চক্র দেদার বালু দিয়ে ভরাট করছে একের পর এক জলাশয়।
বড় বড় বাল্কহেডে করে বরিশাল সদর উপজেলার তালতলী নদীতে বালু এনে সেই বাল্কহেডে ড্রেজার বসিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে নগরীর ভেতরে এই বালু আনা হচ্ছে। আর এ কাজের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে উঠে এসেছে সাবেক কাউন্সিলর ও ছাত্রলীগ নেতা সৈয়দ শামসুদ্দোহা আবিদের নাম।
সম্প্রতি সরেজমিনে কাউনিয়া এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বাল্কহেডে করে বিভিন্ন জায়গা থেকে উত্তোলন করা বালু তালতলী নদী থেকে আটটি ড্রেজারের মাধ্যমে কাউনিয়া এলাকায় কয়েক কিলোমিটারে অন্তত ২২টি পাইপ দিয়ে জলাশয় ভরাটের কাজ চলছে। কাউনিয়ার পুরানপাড়া, হাউজিং, টেক্সটাইল মোড়, রোকেয়া আজিম সড়ক, তোফাজ্জেল হোসেন সড়ক, ময়লা খোলা, কাউনিয়া সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মনসা গলি, কাউনিয়া প্রথম গলি, বিসিক এলাকাসহ বেশ কয়েকটি এলাকার অলিগলিতে ছড়িয়ে আছে ড্রেজারের পাইপ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই জলাশয় ভরাট চক্রটি কাউনিয়া এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিঘার পর বিঘা নিচু জমি, পুকুর ও জলাশয় রাতারাতি ভরাট করে বালুচরে পরিণত করা হচ্ছে।
৩ নম্বর ওয়ার্ডের পুরানপাড়া এলাকার বাসিন্দা ওয়াহাব সিকদার অভিযোগ করেন, ‘৭/৮ মাস আগে ২০/২৫ জন ছেলে এসে আমার জমির ওপর দিয়ে ড্রেজারের পাইপ বসায়। আমি বাধা দিলেও তারা হুমকি-ধমকি দিয়ে পাইপ বসিয়েছে। আমি তাদের কাউকে চিনি না, বলছে ছাত্রদলের লোক। পাইপ দীর্ঘদিন থাকায় আমি আমার জমিতে রাস্তার কাজও করতে পারছি না।’
সাইদুর রহমান কামাল নামের কাউনিয়া হাউজিং এলাকার এক বাসিন্দা মন্তব্য করেন, আইনানুযায়ী জলাশয় বা পুকুর ভরাট দণ্ডনীয় অপরাধ। সেখানে সরকার পতনের পর দিনের আলোতে ড্রেজার দিয়ে অন্তত ৫০টিরও বেশি ছোট-বড় পুকুর ও জলাশয় ভরাট করা হয়েছে এ এলাকায়। তার অভিযোগ, এখানকার বড় থেকে ছোট সব নেতাকর্মী এই ড্রেজার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কমবেশি টাকা পেয়েছেন। তালিকা করে ১৮৭ জনকে চাঁদা দিয়ে কাউনিয়া এলাকাকে ‘মরুভূমি’ করার পরিকল্পনা নিয়েছে চক্রটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরিশাল সিটি করপোরেশনের দুজন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে নিশ্চিত করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এক ঈদের ছুটিতে প্রথম কাউনিয়ার মনসা গলি এলাকায় বড় একটি পুকুর ভরাটের কাজ শুরু হয়। তারপর ধীরে ধীরে ছোট-বড় জলাশয় ও পুকুর ভরাট শুরু করে চক্রটি। শুধু তালতলী নদী থেকেই নয়, কীর্তনখোলা নদী থেকেও ড্রেজারে করে নগরীতে পাইপের মাধ্যমে বালু দিয়ে জলাশয় ভরাটের কাজ চলছে কয়েকটি জায়গায়।
নাম প্রকাশে অনাগ্রহী এক ড্রেজার মালিক স্বীকার করেছেন সবমহলে চাঁদা দেওয়ার কথা। নগরীর কালিজিরা এলাকার বাসিন্দা এই ড্রেজারমালিক বললেন, কীর্তনখোলা নদী থেকে বালু উত্তোলন থেকে শুরু করে কাউনিয়া এলাকায় ড্রেজারের মাধ্যমে বালু সরবরাহের পুরো কাজ ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শামসুদ্দোহা আবিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি কাউনিয়ায় সব বিএনপি নেতা ও কয়েকজন সাংবাদিককে ম্যানেজ করে ড্রেজারের পাইপ দিয়ে বালু সরবরাহ করছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বরিশালের সমন্বয়ক রফিকুল আলম বলছিলেন, ‘কাউনিয়া জুড়ে প্রতিদিন একের পর এক জলাশয় ও পুকুর নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। বিষয়টি সিটি করপোরেশনের সভায় জোড় গলায় বলেছি। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, এটি খুবই দুঃখজনক।’
বরিশাল জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকার বলেছেন, বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিণ বললেন, নগরীতে ড্রেজার চালিয়ে বালু ভরাটের অনুমতি সাবেক প্রশাসক দিয়ে গেছেন। সড়ক পরিদর্শকদের কড়া নির্দেশনা দেওয়া হবে ড্রেজারগুলোর ব্যাপারে। আর এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা খুবই জরুরি।



