পোশাক বদল, ভাঙা তালা, নিখোঁজ যুবক—কালিগঞ্জে জোড়া মৃত্যুতে রহস্য বাড়ছে

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতায় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ফারজানা সুলতানা (৯) হত্যা এবং তাকে কেন্দ্র করে সুমাইয়া খাতুন নামের এক গৃহবধূকে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় চরম রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। এ যেন সাধারণ কোনো অপরাধের গল্প নয়, বরং একাধিক অসঙ্গতি, নীরবতা এবং রহস্যময় অন্তর্ধানের এক জট পাকানো সমীকরণ।
ফারজানা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে পুলিশ। অন্যদিকে, পুলিশের কাছ থেকে সুমাইয়াকে কেড়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠার পর বেশ কয়েক দিন পার হলেও রবিবার বিকেল পর্যন্ত এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি।
জোড়া এই মৃত্যুর ঘটনা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে এমন কিছু প্রশ্ন, যা পুরো ঘটনাকে একটি ভিন্ন মোড়ের দিকে ইঙ্গিত করছে। ফারজানার পোশাক বদলে যাওয়া, ঘরের তালা ভাঙা ও খোলা জানালা, এক যুবকের হঠাৎ নিখোঁজ হওয়া এবং রহস্যময় ফোনালাপ, সব মিলিয়ে আড়ালের কোনো গভীর চক্রান্তের আভাস পাচ্ছেন সচেতন মহল।
রহস্যজনক খোলা জানালা ও বদলানো পোশাক
ঘটনার পেছনের ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে স্থানীয় সূত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। ফারজানা স্কুলে যাওয়ার সময় যে পোশাক পরা ছিল, লাশ উদ্ধারের সময় তার পরনে ছিল ভিন্ন রঙের পাজামা। আর স্কুলের ইউনিফর্মের পাজামাটি দিয়ে পেঁচিয়ে তার পা বাঁধা হয়েছিল। একজন নয় বছরের শিশু নিজ থেকে স্কুলের পোশাক বদলে ফেলবে, নাকি অন্য কেউ প্রমাণ মোছার জন্য বা অপরাধ সংঘটনের সুবিধার্থে তার পোশাক বদলে দিয়েছিল? এই প্রশ্নটি এখন তদন্তের অন্যতম বড় সূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দ্বিতীয় অসঙ্গতিটি ধরা পড়ে ঘরের ভেতর। সুমাইয়ার ঘরের আসবাবপত্র সাধারণত গোছানো থাকলেও, যে ঘরটি থেকে ফারজানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়, সেখানকার পেছনের জানালাটি ছিল একদম খোলা বা ঢিলেঢালাভাবে রাখা। সুমাইয়া যদি নিজেই হত্যাকারী হতো, তবে বন্ধ ঘরের ভেতরের জানালা কেন খোলা থাকবে? এ ছাড়া সুমাইয়ার কাছে ঘরের চাবি থাকা সত্ত্বেও তার কাছ থেকে চাবি না চেয়ে জোর করে তালা কেন ভাঙা হলো, তা নিয়েও ক্ষোভ ও প্রশ্ন তুলেছেন সুমাইয়ার স্বজনরা।
এক যুবকের নিখোঁজ ও প্রভাবশালী মহলের তৎপরতা
ঘটনাটি যেদিন ঘটে (২০ জুলাই), সেদিন দুপুরের পর থেকেই এলাকা থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায় সুমাইয়ার ভাসুরের ছেলে মোস্তাক (২৩)। পুরো ঘটনার পর থেকে মোস্তাকের এই অন্তর্ধান কেবল সন্দেহের ডালপালাই মেলেনি, বরং হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কারও সম্পৃক্ততার জল্পনাও বাড়িয়ে দিয়েছে। মোস্তাক কেন হঠাৎ এলাকা ছাড়ল এবং তার কাছে কী তথ্য ছিল, পুলিশ তা নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
একই সঙ্গে, ফারজানার কান থেকে খোয়া যাওয়া একজোড়া সোনার দুল ও সুমাইয়ার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত আসল অপরাধীকে চিহ্নিত করা অসম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সুমাইয়ার স্বজনরা গুরুতর অভিযোগ এনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, স্থানীয় এক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির চাপের কারণে তারা ভয়ে দ্রুত থানায় গিয়ে মামলা করতে পারছেন না। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ দাফনের ক্ষেত্রেও তাদের চরম গোপনীয়তা রক্ষা করতে হয়েছিল। এমনকি গত বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসক মিজ কাওছার আজিজ ফারজানার বাড়িতে গেলে স্থানীয় এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে সুমাইয়ার মৃত্যুর ঘটনাটি 'গণপিটুনি' হিসেবে এড়িয়ে গিয়ে এ নিয়ে কাউকেই হয়রানি না করার জন্য প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানান। তদন্তের আগেই সুমাইয়াকে 'হত্যাকারী' হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী জড়িত কি না—সে প্রশ্ন এখন চারদিকে।
মামলা, রিমান্ড ও পুলিশের বক্তব্য
ফারজানা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের স্বার্থে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কালিগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক আব্দুর রহিম। তিনি আদালতের কাছে আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে জবরদস্তিমূলকভাবে জব্দ করা পাজামাটি ফারজানার স্কুলের কি না, সে সম্পর্কে সুরতহাল প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা অন্য একজন হওয়ায় তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেননি এই তদন্ত কর্মকর্তা।
তবে মামুনের পরিবারের পক্ষ থেকে জোর দাবি করা হয়েছে, পূর্বশত্রুতার জের ধরে মামুনকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। ঘটনার সময় মামুন দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না বলে যুক্তি দেন স্বজনরা।
সুমাইয়া হত্যার বিষয়ে কালিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলাম বলেছেন, রবিবার বিকেল পর্যন্ত সুমাইয়া হত্যার ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে মামলা দায়েরের আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিবার যদি শেষ পর্যন্ত মামলা না করে, তবে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা দায়ের করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।” তিনি নিশ্চিত করেছেন, দুটি হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ ও চুলচেরা তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করতে কাজ করছে পুলিশ।
উন্মোচনের অপেক্ষায় যেসব প্রশ্ন
নলতার জোড়া মৃত্যুর প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে এখন যে প্রশ্নগুলোর সদুত্তর পাওয়ার ওপর নির্ভর করছে মূল তদন্ত: পাজামা ও পোশাকের রহস্য: স্কুলের পোশাক থাকা অবস্থায় ফারজানার পোশাক কে বা কেন পরিবর্তন করল? গয়না ও ফোনের নিখোঁজ: ফারজানার কানের সোনার দুল এবং সুমাইয়ার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বর্তমানে কার কাছে রয়েছে? চাবি বনাম তালা ভাঙা: চাবি চাওয়া ছাড়াই ঘরের তালা কেন ভেঙে ফেলা হয়েছিল? খোলা জানালা দিয়ে কেউ কি যাতায়াত করেছিল? নিখোঁজ যুবক: ঘটনার পর থেকে উধাও হয়ে যাওয়া মোস্তাকের ভূমিকা কী? তড়িঘড়ি বিচারে হত্যা: মূল তদন্ত বা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়াই সুমাইয়াকে ‘হত্যাকারী’ বানিয়ে গণপিটুনিতে মেরে ফেলার পেছনে আসল মাস্টারমাইন্ড কে?
একটি নয় বছরের শিশুর নৃশংস মৃত্যু এবং তার পরপরই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে পুলিশের সামনে থেকে আরেক নারীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত নাটকের অংশ, তা ফরেনসিক রিপোর্ট, কল রেকর্ড বিশ্লেষণ ও নিরপেক্ষ তদন্তেই স্পষ্ট হবে। নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই জোড়া মৃত্যুর পেছনে লুকিয়ে থাকা মূল অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচনের দাবি জানিয়েছে পুরো এলাকা।





