দস্যুদের উৎপাতে অশান্ত সুন্দরবন: দুই দিনে অপহৃত ২১ জেলে

ছবি: আগামীর সময়
তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর দস্যুদের উৎপাতে ফের অশান্ত হয়ে উঠেছে সুন্দরবন। গত দুই দিনে ২১ জেলেকে অপহরণ করেছে দস্যুরা। পূর্ব সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে বনদস্যু মজনু, করিম শরীফ ও বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর হাতে জেলেরা অপহরণের শিকার হয়েছেন বলে জানা গেছে। বন বিভাগ ও মহাজনরা জেলে অপহরণের বিষিয়টি নিশ্চিত করেছে।
বন বিভাগ ও মৎস্য ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) গভীররাতে শরণখোলা রেঞ্জের ভাঙ্গা, আমবাড়ীয়া ও নারিকেলবাড়ীয়া এলাকা থেকে ১৫ জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় দস্যুরা। একইদিন রাতে চাঁদপাই রেঞ্জের ভদ্রা নদী ও ঝাপসি এলাকা থেকে দুই জেলে এবং শুক্রবার (২৫ সেপ্টম্বর) রাতে শরণখোলা রেঞ্জের আমবাড়িয়া এবং কটকার কালামিয়ার ভারাণী এলাকা থেকে অপহরণ করা হয় চার জেলেদের।
এ সময় পাঁচটি মোবাইল সেট ও একটি মাছ ধরা নৌকাও নিয়ে যায় দস্যুরা। পর পর কয়েকটি অপহরণের ঘটনায় উপকূলের জেলে-মহাজনদের মাঝে নতুন করে দেখা দিয়েছে দস্যু আতঙ্ক।
অপহৃত জেলেদের মধ্যে ১৫ জনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন আরিফ (২৫), সগীর (৩৪), মিঠু (৩০), ফেরদাউস (২৮), ইব্রাহিম (৩৫), ইমরান (২৫), মোস্তাফিজুর (৩৫), আলামিন (২৮), হানিফ (৩৮), মারুফ (৪৯), রিপন (২৬), ফরিদ (৩০), মাসুদ ইজারদার (২৮) ও ইমদাদুল ইজারদার (৩০) ও রিপন (২৮)।
এই জেলেদের বাড়ি বাগেরহাটের শরণখোলা, রামপাল, মোংলা, খুলনার কয়রা এবং বরগুনার পাথরঘাটা ও তালতলী এলাকায়।
এদিকে নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনে জেলেরা যাতে নির্বিঘ্নে মাছ ধরতে পারেন, সেজন্য বনে যাওয়ার আগে বিভিন্ন বনদস্যু বাহিনীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন মহাজনরা। প্রত্যেক দস্যু বাহিনীকে প্রতি গোনে (মাসে দুই ট্রিপ) নৌকা প্রতি চাঁদা দিতে হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা করে। চাাঁদা পরিশোধ করা নৌকায় দেওয়া হয়েছে দস্যু বাহিনীর সংকেত সম্বলিত আলাদা কার্ড। ফলে কার্ডধারী জেলেরা নিরাপদে মাছ ধরার সুযোগ। আর যারা দস্যুদের ধার্য্যকৃত চাঁদা পরিশোধ করে কার্ড গ্রহন করেনি, তাদেরই অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। এ কারণে এখন বনে যেতে ভয় পাচ্ছেন অনেক জেলে।
শরণখোলা এলাকার অপহৃত জেলেদের মহাজনরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শনিবার রাতে সাগরসংলগ্ন সুন্দরবনের ভাঙ্গা, আমবাড়িয়া ও নারিকেলবাড়িয়া এলাকায় জেলেরা মাছ ধরছিলেন। রাত আনুমানিক একটা থেকে দুইটার মধ্যে পৃথক স্থানে ট্রলারযোগে এসে বনদস্যু বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সশস্ত্র দস্যুরা জেলেবহরে হানা দেয়। এ সময় প্রত্যেক নৌকা থেকে একজন করে ১৫ জেলেকে তুলে নিয়ে যায় দস্যুরা।
এই মহাজনরা আরো জানান, যেসকল জেলেদের অপহরণ করা হয়েছে, তাদের নৌকায় দস্যুদের চাঁদা পরিশোধের কোনো কার্ড ছিল না। তাই তাদের মুক্তিদপণ আদায়ের জন্য অপহরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেক মহাজন তাদের জেলেদের নিরাপদে মাছ ধরার জন্য প্রতি গোনে পাঁচ হাজার টাকা করে চাঁদা দিয়ে দস্যুদের কার্ড সংগ্রহ করেছেন। যাদের কার্ড নেই তাদেরই অপহরণ করা হচ্ছে। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে এবং অপহৃতদের উদ্ধারে কঠোর অভিযানের দাবি জানিয়েছেন জেলে ও মহজনরা।
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের জেলেপল্লী দুবলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিল্টন রায় রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকালে মোবাইল ফোনে জানিয়েছেন, সুন্দরবনের পৃথক স্থান থেকে দুই দিনে ২১ জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। বনদস্যু ও অপহৃত জেলেদের অবস্থান শনাক্ত করতে তৎপরতা চলছে বন বিভাগের। এ ছাড়া সুন্দরবনের দস্যু অধ্যুসিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন সূত্র জানিয়েছে, সুন্দরবনে জেলে অপহরণের বিষয়টি খোঁজ নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালানো হবে। এ ছাড়া তাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।




