আছে সংকট-সীমাবদ্ধতা, তবু পর্যটনে সম্ভাবনার হাতছানি সুন্দরবনে

ছবি: আগামীর সময়
সুন্দরবনের নাম শুনলেই এক রোমাঞ্চকর অনুভূতির সৃষ্টি হয় অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের মনে। পৃথিবীর বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বনের বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য সবসময় কাছে টানে প্রকৃতিপ্রেমীদের। এই বনে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদী-খালে বহমান জোয়ার-ভাটার ছন্দ, সারি সারি সুন্দরী, কেওড়াসহ নানা জাতের গাছ, নদীর চরে হরিণ, গাছের ডালে বানরের অবাধ বিচরণ, বন মোরগের হাঁকডাক, হরেক রকম পাখিদের কলকাকলি, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি আর কুমিরের অলস পড়ে থাকার দৃশ্য একমাত্র সুন্দরবনেই দেখা সম্ভব।
বিশেষ করে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য আর সমুদ্রের অপূর্ব মেলবন্ধনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পর্যটনের এক অপার সম্ভাবনা। পাশপাশি রয়েছে নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতাও। তবে যতই সংকট থাকুক না কেন, সুন্দরবন নিয়ে যেন আগ্রহের কমতি নেই ভ্রমণপিপাসুদের। বিশ্ব পর্যটন দিবসের এই দিনে নতুন করে আবারও সামনে এসেছে সম্ভাবনার সেই বাস্তব চিত্র।
সুন্দরবনের প্রধান ও আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটগুলোর সব কটির অবস্থানই হচ্ছে পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জকেন্দ্রিক। যার মধ্যে শরণখোলা রেঞ্জে রয়েছে কটকা, কচিখকালী, ডিমের চর, দুবলা, আলোরকোল এবং নতুন করে যুক্ত হয়েছে আলীবান্দা ইকো-ট্যুরিজমকেন্দ্র। অপরদিকে চাঁদপাই রেঞ্জে রয়েছে করমজল বন্য প্রাণী প্রজনন ও পর্যটনকেন্দ্র, আন্ধারমানিক ও হাড়বাড়িয়া ইকো-ট্যুরিজমকেন্দ্র।
কটকার বিস্তীর্ণ জামতলা সমুদ্রসৈকতে একই সঙ্গে দেখা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। ফুটট্রেইল এবং বনের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় আশপাশে দেখা মেলে অসংখ্য মায়াবী চিত্রা হরিণ আর বানরের বিচরণ। কটকা নদীর চরে দেখা যায় কুমিরের অলস পড়ে থাকা আর বন্য শূকরের ছোটাছৃুটি। জামতলা ওয়াচ টাওয়ারে উঠলে মনে হবে গোটা সুন্দরবনই যেন হাতের মুঠোয়। কচিখালীর বন্য পরিবেশ, টাইগার পয়েন্টের রোমাঞ্চ, ডিমের চরের বালুচরে দিগন্তজোড়া কাশফুলের সমারোহ, দুবলার চর ও আলোরকোলের জেলেজীবনের প্রতিটি পরতে পরতে রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য।
সুন্দরবনের পর্যটন দেশের অন্য সব প্রচলিত পর্যটনকেন্দ্রের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে কোনো স্থাপনা দেখতে আসেন না পর্যটকরা। আসেন দিন-রাত মিলিয়ে ৬ বার রূপ বদলানোর জীবন্ত এবং বাস্তব প্রকৃতি কাছ থেকে উপলব্ধি করতে। সবুজ ঘন জঙ্গল, নদীর স্রোত, পাখির ডাক, হরিণের ছুটে চলা, হঠাৎ গাছের ফাঁকে, নদীর চরে অথবা নদীতে সাঁতার কাটা অবস্থায় বাঘের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনাই বড় আকর্ষণ পর্যটকদের।
বন বিভাগ জানিয়েছে, পর্যটন মৌসুমে ম্যানগ্রোভ এই বনে পর্যটকদের চলাচলে সতর্কতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে বন বিভাগ। পাশাপাশি পর্যটকদের অস্বাভাবিক আচরণে বন্য প্রাণীদের ওপর যাতে কোনো প্রকার বিরূপ প্রভাব না পড়ে, সে বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রতিবছর গড়ে দুই লাখ দেশি-বিদেশের পর্যটক আসেন সুন্দরবন ভ্রমণে। এবার এই সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কটকা, কচিখালী, ডিমের চর, দুবলা, আলোরকোল, কোকিলমনি, করমজল, আন্ধারমানিক, হাড়বাড়িয়াসহ পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের পর্যটন স্পটগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে পর্যটকদের জন্য। এ ছাড়া পর্যটকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে বন বিভাগ ও কোস্ট গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম।
সুন্দরবনের সম্ভাবনাময় ইকো-ট্যুরিজম
প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে সুন্দরবনে গড়ে উঠেছে একাধিক ইকো-ট্যুরিজমকেন্দ্র। এর মধ্যে শরণখোলা রেঞ্জের আলীবান্দা ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এখানে রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার, ঘন সুন্দরী বনের মধ্য থেকে হাঁটার পথসহ (ফুটট্রেইল) বিভিন্ন সুবিধা, যা সুন্দরবনকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। এ ছাড়া রয়েছে হরিণের বেষ্টনী ও কুমিরের পুকুর। তবে হরিণের বেষ্টনীতে পাঁচটি হরিণ ছাড়া হলেও এখনো কুমির ছাড়া হয়নি পুকুরে।
অপরদিকে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ও ইকো-ট্যুরিজমের বিকাশ ঘটলে এর সুফল পাবেন উপকূলের মানুষ। পর্যকদের যাতায়াত, নৌযান, খাবার, গাইড, আবাসন, স্থানীয় পণ্য ও হস্তশিল্পসহ নানা খাতে সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এ ছাড়া স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটক গাইড, নৌযান পরিচালনা, ফটোগ্রাফি ও স্থানীয় সংস্কৃতি উপস্থাপনের কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে সচ্ছল হবে স্থানীয় অর্থনীতির চাকাও।
সুন্দরবন ভ্রমণ সহজ করেছে পদ্মাসেতু
তবে গত কয়েক বছর ধরে সুন্দরবন ভ্রমণে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করেছে পদ্মাসেতু। সেতু চালু হওয়ার পর থেকে সুন্দরবনে আরও বেশি বেড়েছে পর্যটকদের আকর্ষণ। সেতুর কারণে ঢাকা থেকে সড়কপথে সময়ের দূরত্ব কমেছে প্রায় ৩ ঘণ্টা। আগে যেখানে ঢাকা থেকে মোংলা বা শরণখোলায় আসতে সময় লাগত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা, সেখানে এখন লাগছে মাত্র ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টা। এর ফলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন ভ্রমণ হয়েছে অনেকটা সহজতর। পাশপাশি সাশ্রয় হয়েছে সময় ও অর্থের। একাধিক ট্যুর অপারেটর কোম্পানি সূত্র জানিয়েছে এ তথ্য।
আলীবান্দায় যাওয়ায় বিড়ম্বনা
আলীবান্দা ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রটির দূরত্ব বাগেরহাটের শরণখোলার লোকালয় থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার। দিনে দিনে ঘুরে প্রকৃতিকে উপভোগ করার এক অনন্য স্থান। এই কেন্দ্রটি প্রবেশের সবচেয়ে বিড়ম্বনার জায়গাটি হচ্ছে এর প্রবেশ ফি। এখানে যেতে হলে এক দিনের জন্য জনপ্রতি রাজস্ব গুনতে হবে প্রায় ৪০০ টাকা, যা ট্যুরিজমশিল্প বিকাশে বড় অন্তরায় বলে মনে করা হচ্ছে। একইভাবে চাঁদপাই রেঞ্জের করমজন পর্যটনকেন্দ্রে প্রবেশ ফি বা রাজস্ব দিতে হয় জনপ্রতি মাত্র ৪৫ টাকা। যে কারণে প্রায় ৭ গুণ বেশি ফি দিয়ে আলীবান্দায় একবার যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন পর্যটকরা।
প্লাস্টিক বর্জ্য বড় হুমকি
পর্যটনের বিকাশের পাশপাশি সুন্দরবনের পরিবশে রক্ষার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্লাস্টিক-পলিথিকসহ অপচনশীল বর্জ্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রের আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বর্জ্য পর্যটকদের মাঝে বিরূপ প্রভাব তৈরি করছে। আর এই বর্জ্যের ৯০ ভাগই আসছে সুন্দরবনের পাশের লোকালয় থেকে, যা নদীর স্রোতে ভেসে জমা হচ্ছে সুন্দরবনে। এসব বর্জ্য ধ্বংস করছে জীববৈচিত্র্য, তেমনই নষ্ট করছে পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্যও।
টোয়াসের দাবি
সুন্দরবনের সুরক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) সভাপতি মইনুল ইসলাম জমাদ্দার বলেন, পর্যটন ব্যবসায়ীরা এখন অনেক সচেতন। তাদের বর্জ্য তারা নিজেরাই সংরক্ষণ করেন। সুন্দরবনে যে প্লাস্টিক, পলিথিন বা অন্যান্য বর্জ্য দেখা যায়, তা নদী ও সমুদ্রে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত জেলেদের ট্রলার থেকে এবং বনসংলগ্ন এলাকার নদ-নদীর তীরবর্তী হাট-বাজার থেকে ফেলা বর্জ্য। এসবই জোয়ার-ভাটার স্রোতে ভেসে এসে জমা হয় সুন্দরবনে। যত্রতত্র যাতে বর্জ্য ফেলা না হয়, ভবিষ্যতে লোকালয়েও গণসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে টোয়াসের পক্ষ থেকে।
পরিবেশবাদীর ভাষ্য
পরিবেশ সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’ এর প্রধান সমন্বয়কারী মো. নূর আলম শেখ বললেন, প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্যের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও বিস্তার সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন বনসংলগ্ন এলাকার বাজার ও বাসাবাড়ি থেকে স্থানীয় নদ-নদী ও খালে ফেলা এসব অপচনশীল বর্জ্য ভেসে সুন্দরবনে প্রবেশ করছে। এতে বনের মাছ, বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের বিকাশ এবং পরিবেশের ভারসাম্য ধ্বংসের মুখে পড়ছে। আমরা চাই অবিলম্বে প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি সমন্বিতভাবে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করুক। সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ, তাই এটি রক্ষায় সবাইকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
বন বিভাগের ভাষ্য
পর্যটন বিকাশে নানা সংকট, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ৯ মাস সুন্দরবনে পর্যটন মৌসুম। এই সময়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ঢল নামে। গত মৌসুমে সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন আড়াই লাখেরও বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক। বড় কোনো দুর্যোগ না হলে এ বছর আরও বেশি হবে পর্যটকের সমাগম।
সংকটের কথা উল্লেখ করে ডিএফও বলেন, প্রতিনিয়ত নদ-নদী ও সমুদ্র থেকে ভেসে আসা প্লাস্টিক-পলিথিনসহ অপচনশীল বর্জ্য সুন্দরবনের জন্য নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। বন বিভাগ নিয়মিত পরিষ্কার করছে, আবার ভেসে আসছে। এ ছাড়া টোয়াসসহ পরিবেশ সচেতন ট্যুরিস্টরাও নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার করে থাকেন এসব বর্জ্য।
সীমাবদ্ধতার জানিয়ে ডিএফও আরও বলেন, আমাদের জনবল ও জলযান সংটক প্রকট আকার ধারণ করেছে। সীমিতসংখ্যক জনবল দিয়ে বিশাল এই সুন্দরবন রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুতগামী জলযানের সংখ্যাও হাতেগোনা। ফলে বন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খতে হচ্ছে। এতসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা বন বিভাগের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দেখা দিয়েছে।
তবে আলীবান্দা ইকো-ট্যুরিজমকেন্দ্রে পর্যটকদের প্রবেশ ফি কমানো হবে কি না, সে ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন এই বন কর্মকর্তা।



