কাঁচামাটিয়ার মৃত্যু সনদে সই করবেন কে?

কাঁচামাটিয়া নদী— আগামীর সময়
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস বন্ধ হচ্ছে এক নদীর। নাম তার কাঁচামাটিয়া। একসময় যে নদীতে ছিল স্রোত, মাছের খেলা, নৌকার গুঞ্জন। আজ সেখানে শুধু কাদামাটি আর শুকিয়ে যাওয়া স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস। সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, এই মৃত্যুর কোনো শব্দ নেই। শোকসভা নেই, কালো ব্যাজ নেই, পতাকা অর্ধনমিত নেই। নদীটি যেন নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে, আর তার এই নিঃশব্দ বিদায় যেন কারও চোখেই পড়ছে না।
কাঁচামাটিয়ার জন্ম ব্রহ্মপুত্র থেকে। আজ সেখানে ফিরতে পারছে না এ নদী। তার মুখ বন্ধ। শ্বাসরন্ধ্রে জমেছে পলি। দুই পাড় বেঁধে ফেলেছে দখলদাররা। তার রক্তে মিশেছে বর্জ্য। আর মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার মৃত্যুকে প্রাকৃতিক ঘটনা বলে চালিয়ে দিচ্ছে।
ঈশ্বরগঞ্জের একটু বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের কাছে গেলে এখনো কাঁচামাটিয়ার গল্প জীবন্ত হয়ে ওঠে। কথা বলতে বলতে তাদের চোখ যেন দূরে কোথাও হারিয়ে যায়— সেখানে এখনো বেঁচে আছে এ নদী। একসময় কাঁচামাটিয়া শুধু একটি নদী নয়, ছিল পুরো এলাকার জীবনরেখা। নদীর বুক চিরে দুপুরের রোদে ভেসে যেত নৌকা, পাটবোঝাই বড় বড় নৌযান এসে ভিড় করত ঘাটে। নদীর তীরের গুদাম ঘরগুলোতে দিন-রাত চলত বেচাকেনার ব্যস্ততা, হাটের দিনে ঘাটে এত ভিড় হতো যে পা ফেলার জায়গা পাওয়া যেত না।
বৃষ্টি নামলেই কাঁচামাটিয়া যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেত, পানি ফুলে উঠত, ঢেউয়ে ভরে যেত তার বুক। আবার শুষ্ক মৌসুমেও থাকত পানি। জেলেরা জাল ফেলত নদীর বুকে, শিশুরা হাসতে হাসতে সাঁতার কাটত তার পানিতে। কৃষকেরা সেই পানিতেই মাঠে সেচ দিত, ফসল বাঁচাত। কাঁচামাটিয়া তখন শুধু পানি বহন করত না। সে বহন করত জীবিকা আর মানুষের আশা।
আজ সেই নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ সহজেই বলতে পারে- ‘এখান দিয়েই বয়ে যেত নদীর মূল স্রোত।’ বাক্যটি শুনলে মনে হয় কেউ নিজের মায়ের কবর দেখিয়ে বলছে— ‘এখানেই ছিল’।
একদিন যদি ঈশ্বরগঞ্জের ইতিহাস লেখা হয়, তাহলে হয়তো সেখানে শহরের জন্ম রাস্তার পাশে নয়, নদীর পাশে শুরু হয়েছিল বলে উল্লেখ থাকবে। কারণ সব প্রাচীন সভ্যতার মতো এখানেও প্রথমে এসেছিল নদী, তারপর মানুষ। মানুষের সঙ্গে এল বাজার, বাজারের সঙ্গে এল ব্যবসা, ব্যবসার সঙ্গে এল ঘরবাড়ি। আর ধীরে ধীরে সেই ঘরবাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল লোভ। সেই লোভের কারণেই থেকে যাবে পরিবর্তনের ভারে ক্লান্ত এক নদীর মৃত্যু গল্প।
নদীর মৃত্যু কখনও গোলাগুলিতে, বিস্ফোরণে বা একদিনের ভাঙনে হয় না। নদী মারা যায় অনেকটা বৃদ্ধ মানুষের মতো ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে। প্রথমে তার চলার গতি কমে আসে, পায়ে যেন ভার নেমে পড়ে। তারপর তার চোখের মতো জলধারা ঝাপসা হয়ে যায়। স্মৃতির মতো প্রবাহও এলোমেলো হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সে আর দাঁড়াতেই পারে না। শুয়ে পড়ে নিজেরই তলদেশে।
কাঁচামাটিয়ার ক্ষেত্রেও ঠিক সেই ধীর মৃত্যুরই গল্প। শুরুতে মুখ সংকুচিত হয়েছে, কমেছে স্রোত, জমেছে পলি। ফলে মাছের ঝাঁক আর ফিরে আসেনি, জেলেরা হারিয়ে গেছে জীবিকার পথ বদলে। খাল-সংযোগগুলো একে একে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এরপর এসেছে দখল। এখন কাঁচামাটিয়া যেন নিজেরই অতীতের ছায়া। বেঁচে নেই পুরোপুরি, মরেও যায়নি। শুধু অপেক্ষা করছে শেষ ঘোষণার। যে ঘোষণায় একদিন বলবে, এখানে একটি নদী ছিল।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, কাঁচামাটিয়া ছিল একসময় ঈশ্বরগঞ্জের অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রাণ। সড়কপথের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার আগে নদীপথই ছিল মানুষের প্রধান ভরসা। বাজার, ব্যবসা, কৃষিপণ্য পরিবহনসহ সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই নদী। অনেক পরিবার এখনও তাদের পূর্বপুরুষদের গল্প শুনিয়ে বলে, কীভাবে নদীর ঘাট ঘিরে ব্যবসা গড়ে উঠেছিল। নদী শুধু একটি জলধারা নয়; এটি ছিল একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, একটি জীবন্ত অর্থনৈতিক করিডোর।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার চরশিহারি গ্রামের বাসিন্দা লাল মিয়া। তিনি ছোট একটি ব্যবসা করেন ঈশ্বরগঞ্জ বাজারে। নদী নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘আমার বয়স বেশি না। ১৯৭১ সালে জন্ম। তবে আমার এটুকু বয়সেই নদীর যে পরিবর্তন দেখেছি তা কষ্টদায়ক। আমার বাবার আমলের কথা বাদই দিলাম। এই নদী দিয়ে পাট নিয়ে যেতে দেখেছি নিয়মিত। নৌকা দিয়ে মাটির পাতিল নিয়ে যেতে দেখেছি। মাটির পাতিলের নৌকা দেখলেই ছুটে যেতাম গুলতি নিয়ে। দূর থেকে গুলতি মেরে পাতিল ভাঙার চেষ্টা করতাম। মাঝেমধ্যে দৌড়ানিও খেতে হতো। ‘কাঁচামাটিয়া’র উপর যে ব্রিজ সেই ব্রিজের কাছে দুটি বাঁশ দিয়েও নদীর তলার মাটি স্পর্শ করা যেতো না। সারা বছর এই পরিমাণ পানি থাকতো। আর এখন বর্ষাকালেও ১০ ফুট পানি থাকে না। নদীতে প্রচুর মাছ ধরতাম হাত দিয়ে। পানি ছিল স্বচ্ছ। আর এখন মাছ নেই। থাকবে কি করে? মাছ থাকার পরিবেশ তো নেই। পানিতে যে পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা তাতে মাছে জন্ম নেওয়ার কথাও না। পানি দূষিত হতে হতে চরম মাত্রায় পৌঁছেছে।’
কাকনহাটি গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদুল হাসানের মন্তব্য, ‘নদীতে আবর্জনা ফেলার কারণে মাছ বাঁচার পরিবেশ নেই। নদীর বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ বাঁধ, মাছের অবাধ বিচরণে বাধা, এসব কারণে মাছ কমে যাচ্ছে। সারা বাজারের ময়লা যায় ব্রিজের পাশে। সেই ময়লা পড়ে নদীতে। বাজারের অনেক হোটেলের ময়লা ফেলা হয় সরাসরি নদীতে। কিন্তু এগুলো সমাধানে কেউ এগিয়ে আসে না। তাই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের কাঁচামাটিয়া। কাঁচামাটিয়ার মৃত্যু মানে শুধু একটি নদীর মৃত্যু নয়; এটি একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষয়। এই ক্ষয়ের ফলে নৌপরিবহন হারিয়ে গেছে। জেলেদের আয় কমেছে। কৃষিতে পানির সংকট বেড়েছে।’
স্থানীয়রা মনে করেন, মৃতপ্রায় এই নদীকে পুনর্জীবিত করা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, দখলমুক্ত করা, নিয়মিত খনন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। প্রশাসন, পরিবেশবিদ, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষ, সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো নদীকে বাঁচানো যায় না।’
দাম কমছে চীনের গাড়ির
১২ জুন ২০২৬
নদী শুকিয়ে গেলে মানুষ বিকল্প খোঁজে। কিন্তু সেই বিকল্প প্রায়ই ব্যয়বহুল, অস্থায়ী এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই ক্ষতি থেকে বাঁচতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান স্থানীয় জনগণ। হয়তো একদিন এ নদী পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। সেদিন ঈশ্বরগঞ্জের কোনো শিশু তার দাদার কাছে জানতে চাইবে—
কাঁচামাটিয়া নদী কোথায় ছিল?
তখন দাদা দূরে কোনো শুকনো জমির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলবেন—
‘ওখানেই ছিল।’
সেদিন হয়তো নদী আর থাকবে না। থাকবে শুধু একটি নাম। কিছু স্মৃতি। শুধু দেখার বিষয়, কাঁচামাটিয়ার সেই মৃত্যু সনদে সই করেন কে?
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান জানান, নদী রক্ষায় আমরা কাজ করছি। ইতোমধ্যে নদীর জমে থাকা কচুরিপানা সরানোর কাজ শুরু হয়েছে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে পানি উন্নয়ন বোর্ডে আমরা চিঠি লিখেছিলাম। প্রয়োজনে আবার চিঠি লিখা হবে। সংসদ সদস্যের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। খুব দ্রুত কোনো প্রজেক্টের মাধ্যমে কাজটি এগিয়ে নেওয়ার জোর চেষ্টা চলছে।






