আন্দোলনের খবর সুন্দরবনে গেলে কী হবে, সেই ভয় বনজীবীদের ঘরে ঘরে

রাজপথে মানববন্ধন আর বিক্ষোভ চলছে বনদস্যুমুক্ত সুন্দরবনের দাবিতে। আর সুন্দরবনঘেঁষা ঘরগুলোয় সেই মিছিলের ছবি-ভিডিও দেখে ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছেন বনজীবী পরিবারের নারীরা। তাদের আশঙ্কা, এসব খবর বনের দস্যুদের কানে গেলে স্বজনরা বনে ঢুকলেই নির্যাতনের শিকার হতে পারেন।
গত ২৮ অক্টোবর গাবুরায় মানববন্ধনের মধ্য দিয়ে সুন্দরবন-উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগরে পাঁচ দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচিও হয়েছে। এতে অংশ নিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালি এবং তাদের স্ত্রী-সন্তানরা। দাবি একটাই, জীবিকার জন্য বনে যাওয়া মানুষগুলো যেন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন।
২০১৮ সালের নভেম্বরে ৩২টি দস্যু বাহিনীর সদস্যদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেছিল। তবে স্থানীয় বনজীবীদের দাবি, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বনে আবার একাধিক দস্যু চক্র সক্রিয় হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এখন সুন্দরবনের নদী-খালে অন্তত ১২ থেকে ১৪টি দল সক্রিয়। তারা নৌকা থামিয়ে জেলেদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে। আগাম সমঝোতা ছাড়া বনে ঢোকাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
মুন্সীগঞ্জের হরিনগর, সিংড়তলী, মথুরাপুর ও চুনকুড়ির একাধিক জেলে অভিযোগ করেন, বনে ঢুকতে নৌকাপ্রতি মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১ লাখ টাকার বেশি চাওয়া হয়। একাধিক দল আলাদাভাবে টাকা দাবি করায় খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, এই অর্থ স্থানীয় কিছু মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে দস্যুদের কাছে পৌঁছায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিংড়তলীর এক জেলে বলেছেন, ‘লোকালয়ে থাকা দস্যুদের সহযোগীদের নাম বললে আমাদের আর কোনো দিন সুন্দরবনে যাওয়া হবে না। মাছ ধরা ও কাঁকড়া সংগ্রহের জন্যও নৌকাপ্রতি অন্তত ৪০-৫০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জোরদার অভিযানের কথা বলছে। বিভিন্ন সময়ে দস্যুদের আত্মসমর্পণ এবং অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। তবু বনজীবীদের আতঙ্ক কাটেনি। নিরাপত্তাহীনতায় অনেকে পেশা ছাড়ার কথা ভাবছেন।
এই আন্দোলন গাবুরা এবং মুন্সীগঞ্জের হরিনগরের মথুরাপুর, সিংহড়তলী ও চুনকুড়ির বনজীবী পরিবারের নারীদের মনে আশা যেমন জাগিয়েছে, তেমনি আশঙ্কাও বাড়িয়েছে। সিংহড়তলী গ্রামের জেলে দীনবন্ধু বাউলিয়ার স্ত্রী সাবিত্রী বাউলিয়া বললেন, ‘শহরে মিটিং-মিছিল হচ্ছে, এর ফল কী হয় কে জানে। ডাকাতের বিরুদ্ধে এই মিছিলের কথা যদি ওদের কানে যায়, তাহলে আবার বনে গেলে কী যে নির্যাতন করে!’
একই উদ্বেগ মথুরাপুর জেলেপাড়ার সনেকা মণ্ডলের কণ্ঠেও। তার ঘরের বারান্দা পর মালঞ্চ নদী সেটি পার হলেই সুন্দরবন। স্বামীসহ দুই সন্তান সেই বনে মাছ-কাঁকড়া ধরেন। সেই বারান্দায় বসে তিনি বলেছেন, ‘ডাকাতির বিরুদ্ধে এসব মিছিল-মিটিংয়ের খবর বনের ডাকাতিরা সব পাচ্ছে। আমাগা স্বামী-সন্তানরা মিছিলে যাচ্ছে। অনেক নিষেধ করিছি, শোনে না, জোর করে যাচ্ছে। এসব ছবি-ভিডিও দেখে বনে গেলে ডাকাতিরা ধরে নিয়ে আবার মাইরধোর করে কি না, সেই ভয় করছি।’
এই ভয় ছুঁয়ে গেছে শিশুদেরও। ৬৩ নম্বর হরিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শশী মণ্ডলের বাবা সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরেন। সে বলে, ‘বাদায় এখন খুব ডাকাত শুনেছি। ডাকাত বন্ধ করার জন্য বাজারে মিছিল-মিটিং হচ্ছে। বাবা অনেক দিন বাদায় যায় না। আমাদের বাড়িতে ভালো খাবারও রান্না হয় না।’
গতকাল রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হরিনগর বাজারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেন স্থানীয় বনজীবীসহ মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের বাসিন্দারা। সেখানে কথা হয় চুনকুড়ি গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা প্রশান্ত মণ্ডলের সঙ্গে। তার দুই ছেলে সুশান্ত ও প্রসেনজিৎ সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরেন। আন্দোলনের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে উল্টো প্রশ্ন রাখেন তিনি, ‘এসব করে কি আসলেই সুন্দরবন থেকে ডাকাত নির্মূল হবে?’
এরপর উৎকণ্ঠা নিয়ে যোগ করেন, ‘এখানে যেসব লাইয়েরা (বনজীবীরা) এসেছে, তারা আবার বনে গেলে ডাকাতিরা ক্ষতি করবে না, তার গ্যারান্টি কী? মিছিলে যারা যোগ দিয়েছে, বনে গেলে তাদের ওপর নির্যাতন বাড়ে কি না, এই সন্দেহ আমার।’
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে সুন্দরবন থেকে করিম-শরীফ, নানা ভাই, ছোট সুমন, আলিফ, আসাবুর বাহিনীসহ বিভিন্ন দস্যু চক্রের সদস্যদের আটক করা হয়েছে। এ সময় দস্যুতার কাজে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র এবং গুলি উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে বনদস্যুদের জিম্মিদশা থেকে জেলে ও পর্যটককে জীবিত উদ্ধারও করা হয়েছে।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া বিভাগ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে সুন্দরবনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অভিযান চলছে। এর অংশ হিসেবে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া সুন্দরবনসহ সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবন লাগোয়া বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তবে উপকূল ও সুন্দরবনের বনজীবীদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা লেখক ও গবেষক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেছেন, ‘বাস্তবে সুন্দরবনে দস্যু-আতঙ্ক এখনো কমেনি। ভয়ে অনেক বনজীবী পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। শুধু বনের ভেতরে অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। দস্যুদের অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতাদের বিরুদ্ধেও কার্যকর এবং কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
বনজীবী পরিবারের নারী, শিশু ও প্রবীণদের উৎকণ্ঠার কথা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, ‘তাদের কাছে বনদস্যুমুক্ত সুন্দরবনের দাবি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটি পরিবারের নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার প্রশ্ন। স্বজনরা নিরাপদে বনে যাবেন, কাজ করবেন, আর দিন শেষে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরবেন, এটুকুই তাদের চাওয়া। সুন্দরবনের নিরীহ বনজীবীরা শুধু এই সামান্য নিরাপত্তাটুকুই চান।’
একই দাবিতে গতকাল দুপুরে শ্যামনগর উপজেলা সদরেও বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন বনজীবীরা। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দেন উপকূলের কয়েকশ বনজীবী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।



