শ্যামনগর
হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে স্কুলে যায় শিশুরা

ময়লা পানি মাড়িয়ে স্কুল ছুটি শেষে বাড়িতে ফিরছে শিক্ষার্থীরা, ছবি : আগামীর সময়
বই-খাতা বুকে চেপে, ইউনিফর্ম ভিজিয়ে হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতে হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। সামান্য বৃষ্টিতেই সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের (পাঁচু সরদারের মোড় এলাকার) ১৪৯নং শ্রীফলকাটি পশ্চিমপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুর্ভোগ যেন নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের মাঠটি নিচু হওয়ায় বৃষ্টির পানি সহজে বের হতে পারে না। চারপাশে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো মাঠ পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে বিদ্যালয়ে প্রবেশের একমাত্র পথ হাঁটুসমান পানির মধ্য দিয়ে পাড়ি দিতে হয় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের।
জলাবদ্ধতার কারণে শুধু শ্রেণিকক্ষে যাতায়াতই নয়, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মাঠে পানি জমে থাকায় প্রার্থনা সমাবেশ, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কিংবা শরীরচর্চার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক শিক্ষার্থী কাদা-পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে অনীহা প্রকাশ করছে বলেও জানিয়েছেন অভিভাবকরা।
গতকাল রবিবার সরেজমিন দেখা যায়, গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে স্কুলের ফটক ও পুরো মাঠে ময়লা পানি জমে আছে। হাঁটুসমান পানি পেরিয়ে প্লে থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী আসা–যাওয়া করছে। স্কুল মাঠের পানি যাওয়ার ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় এই পানি স্কুলের মাঠে এসে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছে। তবে মাঠে ময়লা পানি থাকায় স্কুলের শিশুরা খেলতে পারছে না।
স্কুলের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলে, আমাদের প্রতিদিন ময়লা পানি মাড়িয়ে স্কুলে যাওয়া–আসা করতে হয়। আমাদের কাপড় প্রতিদিন নষ্ট হয়। মাঠে পানি থাকায় টিফিনের সময় খেলা করতে পারি না।
বিদ্যালয়টির চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া খাতুন জানায়, বৃষ্টি হলেই মাঠে অনেক পানি জমে। পানি পার হতে গিয়ে অনেক সময় পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। স্কুলে এসে ভেজা স্কুল ড্রেস পরেই ক্লাস করতে হয়।
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু রায়হানের ভাষ্য, মাঠে খেলতে খুব ভালোবাসি; কিন্তু বর্ষার সময় মাঠে সব সময় পানি থাকে। টিফিনের সময়ও খেলতে পারি না। শুধু ক্লাস করে বাড়ি চলে যাই।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলছিল, ছোট ভাই-বোনদের অনেক কষ্ট হয়। বিশেষ করে ওয়ান-টুর ছেলেমেয়েদের অনেক কষ্ট হয় স্কুলে আসতে। কেউ কেউ কাদায় পিছলে পড়ে যায়। আমরা চাই, দ্রুত মাঠটা ভরাট করে দেওয়া হোক, যাতে সবাই স্বাভাবিকভাবে স্কুলে আসতে পারে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানালেন, বর্ষা মৌসুম এলেই দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের নিরাপদে শ্রেণিকক্ষে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো কখনো অভিভাবকদের কোলে করেও শিশুদের বিদ্যালয়ে আনতে হয়।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার মুখোমুখি হলেও স্থায়ী সমাধানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তারা দ্রুত ড্রেন নির্মাণ কিংবা মাঠ ভরাটের মাধ্যমে টেকসই সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
রফিকুল ইসলাম, আজবাহার আলী ও শামসুর রহমানসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এলাকার গুরুত্বপূর্ণ এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমন অবস্থা অত্যন্ত দুঃখজনক। মাঠে দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। নোংরা পানির মধ্যে চলাচল করতে গিয়ে তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেছেন, পানি নিষ্কাশনের কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই। তাই সামান্য বৃষ্টি হলেই মাঠে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে যেতে অনেক কষ্ট হয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন হলেও এই দুর্ভোগের কোন সমাধান পাচ্ছিনা।
শ্যামনগর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহিন হোসেন বলেছেন, বিদ্যালয়ের মাঠে জলাবদ্ধতার বিষয়টি আমরা দেখেছি। মাঠটি কীভাবে দ্রুত ভরাট করা যায়, সে বিষয়ে চেষ্টা চলছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইনামুল হক বললেন, বিদ্যালয়ের মাঠ ভরাটের জন্য তালিকা করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।




