সব গিলে খাচ্ছে বাঁকখালী নদী, চোখের সামনে স্বপ্ন শেষ সিরাজুলের

গতকালও এখানে ছিল সিরাজুল হকের বসতবাড়ি, আজ সব শেষ, ছবি : আগামীর সময়
নিস্তব্ধ চোখে নদীর উত্তাল স্রোতের দিকে তাকিয়ে ছিলেন সিরাজুল হক। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে ছিল তার দুই কক্ষের ঘর, সেখানে এখন শুধু ঘোলা পানির স্রোত। বহু বছরের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ে গড়ে তোলা বসতভিটা একে একে গিলে খাচ্ছে বাঁকখালী নদী। চোখের সামনে নিজের শেষ আশ্রয়টুকু নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখে যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, পরিবার নিয়ে কোথায় যাবেন?
রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের দৌছড়ি দক্ষিণকুল পূর্বপাড়ায় টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বাকখালী নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতোমধ্যে সিরাজুল হকের বসতভিটার অর্ধেক অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। বাকি অংশও যেকোনো মুহূর্তে নদীগর্ভে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
ভাঙনের শিকার সিরাজুল হক বললেন, এক সপ্তাহ ধরে একটু একটু করে ভাঙছিল। কয়েকদিন আগে আমার দুই রুমের ঘর নদীতে চলে গেছে। গত বছর বর্ষাতেও ভিটের অনেক অংশ ভেঙে গিয়েছিল। এবার পুরো বাড়িটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই বাড়ি ছাড়া আমার আর কোথাও জায়গা নেই। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় থাকব, বুঝতে পারছি না।
একই আতঙ্কে দিন কাটছে ৭০ বছর বয়সী মোজাম্মেল হক ও তার স্ত্রী মমতাজ বেগমের। সন্তানহীন এই বৃদ্ধ দম্পতির জীবনের একমাত্র সম্বল তাদের ছোট্ট বসতভিটাও এখন নদীভাঙনের মুখে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মমতাজ বেগম বলেছেন, মানুষের কাজ করে সংসার চালাই। অনেক কষ্টে এই বসতবাড়িটুকু করেছি। এখন সেটাও নদীতে ভেঙে যাচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের আর কোনো সম্পত্তি নেই। কোথায় যাব, কী করব বুঝতে পারছি না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা এলেই বাঁকখালী নদীর ভাঙনে কচ্ছপিয়া ও আশপাশের জনপদে শুরু হয় একই দুর্ভোগ। সাময়িকভাবে বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। ফলে বছর ঘুরতেই নতুন করে নদীগর্ভে হারিয়ে যায় মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও জীবিকার শেষ সম্বল।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মাজেদ বললেন, প্রতি বছর আমাদের এলাকার মানুষ নদীভাঙনের শিকার হয়। অনেক পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। আমরা আর অস্থায়ী সমাধান চাই না। দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও নদী ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করা হোক।
সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক রামু উপজেলা ছাত্রদল বেলাল উদ্দিন জানিয়েছেন, বাঁকখালী নদীর ভয়াবহ ভাঙনে ইতোমধ্যে রামুর বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের আরও দুই শতাধিক ঘরবাড়ি এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
তার ভাষায়, শুধু নদীভাঙনই নয়, টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, কাউয়ারখোপ, কচ্ছপিয়া ও গর্জনিয়াসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল বন্যাকবলিত হয়েছে। নদীর তীব্র স্রোত ও ভাঙনের কারণে হাজারো পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেছেন, নদীভাঙনের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।
তবে আইনজীবী শিপ্ত বড়ুয়ার মতে, প্রশাসনের এই আশ্বাসে এখনো স্বস্তি ফিরেনি নদীভাঙনের শিকার মানুষের জীবনে।
তাদের ভাষ্য, কয়েক বস্তা ত্রাণ কিংবা সাময়িক সহায়তায় দুর্ভোগের অবসান হবে না। বাঁকখালী নদী রক্ষায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ, পরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসনের কার্যকর উদ্যোগই পারে প্রতি বর্ষায় পুনরাবৃত্ত এই মানবিক বিপর্যয়ের স্থায়ী সমাধান আনতে।




