সরাইলে তিতাস নদীর ওপর সেতুর অপেক্ষায় যুগ যুগ

তিতাস নদীর ওপর সেতুর দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের- আগামীর সময়
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের গ্রাম ক্ষমতাপুর। বুড্ডা তিতাস নদীর পাশ ঘেঁষে গ্রামটির অবস্থান। একদিকে নদী, অন্যদিকে শাপলা বিল। নদীর বাঁকে বাঁকে গ্রামটির অবস্থান। দেখতে ধনুকের মতো বাঁকা, নয়নাভিরাম ছবির মতো। শুষ্ক মৌসুমে সবুজ-শ্যামল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। তবে ভৌগোলিকভাবে গ্রামটি বছরের বেশিরভাগ সময় পানিবেষ্টিত থাকে। সারা বছর যোগাযোগে নৌকাই একমাত্র ভরসা।
গ্রামটিতে আগে অনেক পরিবার বসবার করলেও যোগাযোগব্যবস্থা না থাকাসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে দিন দিন পরিবারের সংখ্যা কমে আসছে। বর্তমানে গ্রামটিতে ২০০ পরিবার বসবাস করছে। গ্রামের পাশের তিতাস নদীর ওপর সেতু নেই। যোগাযোগের জন্য একটি সেতুর দাবি যুগ যুগ ধরে করে আসছেন এই গ্রামের বাসিন্দা। তবে বাধ্য হয়ে গ্রাম ছাড়ছেন অনেকেই। দুর্গম যাতায়াতব্যবস্থার ভোগান্তি থেকে বাঁচতে অনেকেই বসতি গড়েছেন নদীর দক্ষিণ পাড়ের বুড্ডা গ্রামে।
শাপলা বিলসহ এই বিশাল হাওরের হাজার হাজার একর জমির ফসল পরিবহনে যুগ যুগ ধরে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের। কাঁধে করে, নৌকায় তুলে ঘরে তুলতে হয় হাওরের ফসল। সেতু নির্মাণ হলে যুগ যুগ ধরে সীমাহীন ভোগান্তির অবসান হবে, হাসি ফুটবে কৃষকের মুখে। এ ছাড়াও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাময় বাঁকে প্রতিদিন ঘুরতে আসা প্রকৃতিপ্রেমীদের যাতায়াতের সুবিধাও হবে।
সরাইল উপজেলার একমাত্র বাণিজ্যিক তিতাস অ্যাগ্রো ফার্মের ড্রাগন বাগান নদীর দক্ষিণ পাড়ে। কাসিমখাঁর বাজার (বুড্ডাঘাট), মৎস্য আড়ৎসহ ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
এ ছাড়াও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শাহবাজপুর প্রথম গেট এলাকা থেকে উত্তর দিকে শাহবাজপুর-বুড্ডা সড়ক ও সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই আঞ্চলিক সড়কের পূর্বদিকে কালীকচ্ছ-আখিতারা-বুড্ডা সড়ক দুটি মিলেছে তিতাস নদীর বুড্ডা ঘাট এলাকায়।
ক্ষমতাপুর গ্রামবাসী, কুচনী, বুড্ডা, শাহবাজপুর, আঁখিতারা, নোয়াগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের শাপলা বিলে যাতায়াতের সুবিধার্থে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত সেতুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন কত দূর কেউ জানে না।
ক্ষমতাপুর ছেড়ে পাশের বুড্ডাগ্রামে বসতিগড়া আজিজউল্লাহ, রাশেদউল্লাহসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা যোগাযোগব্যবস্থা, নদীর ভাঙনসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে গ্রাম ছাড়লেও গ্রামটির মায়া ছাড়তে পারেননি।
অবহেলিত ওই গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা সফিউল্লাহ মিয়া, ছান্দু মিয়া, আবদুল জলিল, আলেকশাহ মিয়া, অহিদ হোসেন জানিয়েছেন, ১৫০ বছরের অধিক সময় আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা শাহবাজপুর মোড়াহাটি ও নিয়ামতউল্লাহ পাড়া থেকে এসে মৎস্য আহরণ ও কৃষিকাজের সুবিধার্থে প্রথমে অস্থায়ীভাবে বাথান ঘর, ধানের খলা ও পরে স্থায়ী বসতি গড়েন। বেশ কয়েকটি পরিবার বুড্ডা গ্রামে চলে যাওয়ার পর বর্তমানে গ্রামটিতে প্রায় ২০০ পরিবার বাস করে। গ্রামে একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষে অনেক শিক্ষার্থী দুর্গম যাতায়াতব্যবস্থার কারণে শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ে।
তারা আরও জানিয়েছেন, কৃষিপ্রধান গ্রাম হলেও মৎস্য খাত থেকেও উপার্জন হয়। প্রতিটি পরিবার বর্ষাকালে গড়ে দৈনিক ২-৩ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করে। নৌকাও আমাদের আয়ের হাতিয়ার। মাছ ও ধানে ভরা এই সবুজে সবুজে ঘেরা সুখের স্বপ্ন ফেলে গ্রাম ছেড়ে যেতে মন চায় না। শুধু দরকার একটি বেড়িবাঁধ, নদীর ওপর একটি সেতু।
বুড্ডা গ্রামের কৃষক আনিছ মৃধা, স্বপন দাস, শহীদ মিয়া, দুলাল বাহাদুর এবং কুচনী গ্রামের কৃষক শাহজাহান মিয়া, নারায়ণ দাস বললেন, নদীর ওপর একটি সেতুর অভাবে শাপলা বিলের ফসল আনতে আমাদের কষ্ট হয়।
এ বিষয়ে শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আরিজ মিয়া ও নোয়াগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের (বুড্ডা-কুচনী) সদস্য মো. অলি আহাদ মৃধা বললেন, গ্রামটি ভাঙন থেকে রক্ষার জন্য বেড়িবাঁধ ও যাতায়াত সুবিধার জন্য তিতাস নদীর ওপর সেতু নির্মাণ জরুরি।
শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. মুনির হোসেন ভূঁইয়া বলেছেন, নদী ও হাওরবেষ্টিত ক্ষমতাপুর গ্রামটি ভৌগোলিকভাবে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। গ্রামটির বাসিন্দাদের চলাচলের সুবিধার্থে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।
নোয়াগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনসুর আহমেদের ভাষ্য, বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের জমি রয়েছে শাপলা বিলে। চাষাবাদের জন্য যাতায়াত ও ফসল ঘরে তোলার জন্য বুড্ডা তিতাস নদীর ওপরে সেতু নির্মাণ দীর্ঘদিনের দাবি।
উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী আবদুর রহিম বলেছেন, ‘আমাদের কাছে তালিকা চাওয়ার পর বুড্ডা-ক্ষমতাপুরের পাশ ঘেঁষা তিতাস নদীর ওপর সেতু নির্মাণে অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার ব্রিজ প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবনা দাখিল করা হয়েছে। এরপর আর কোনো অগ্রগতি নেই। যদি অনুমোদন হয়ে আসে পরবর্তী কার্যক্রম চলবে।’




