বেকারত্ব ঘোচাতে নার্সারি, মাসে ৩ লাখ টাকার গাছ বিক্রি করেন মেহেদী

নিজের নার্সারিতে মেহেদী হাসান। ছবি: আগামরি সময়
চাকরির পেছনে না ছুটে নার্সারি ব্যবসায় সফলতার স্বপ্ন দেখছেন পটুয়াখালীর বাউফলের যুবক মেহেদী হাসান। মাত্র ৭০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা তার নার্সারি এখন বিস্তৃত হয়েছে ১২৫ শতক জমিতে। সেখানে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ প্রজাতির গাছ। প্রতি মাসে এখান থেকে প্রায় ৩ লাখ ঔষধি গাছ বিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
উপজেলার মদনপুরা ইউনিয়নের মেহেদী বাউফল সরকারি কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেছেন। তার বাবা একজন কৃষক। ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজ দেখে বড় হওয়ায় কৃষির প্রতি তার ছিল ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থেকেই ২০১৮ সালে পরিবারের পতিত জমিতে সবজি চাষের মধ্য দিয়ে উদ্যোগ শুরু করেন তিনি। পরে ধীরে ধীরে নার্সারি ব্যবসায় যুক্ত হন।
মেহেদী হাসান বলেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, সততার সঙ্গে এই পেশায় থেকে মানুষের সেবা করা যায়। ঘুষ দিয়ে চাকরি নেব না, কারও অধীনে চাকরি করার পরিবর্তে নিজেই কর্মসংস্থান তৈরি করব—এমন চিন্তা থেকেই কৃষিতে আসা। কাজ কখনো মানুষকে ঠকায় না।’
তার নার্সারিতে ঔষধি, বনজ, ফলজ ও সবজিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা উৎপাদন ও বিক্রি করা হয়। ঔষধি গাছের মধ্যে রয়েছে স্টেভিয়া, পিসফল, করোসোল, অপরাজিতা, তুলসী, নিম, অর্জুন, আমলকী, হরীতকী, বহেড়া, চুইঝাল, সজনে, বেল, কাঠবাদাম, পেস্তাবাদাম ও অ্যালোভেরাসহ নানা প্রজাতির গাছ।
মেহেদী জানিয়েছেন, ৩৩ শতক জমিতে নার্সারি শুরু করলেও বর্তমানে তা ১২৫ শতকে বিস্তৃত হয়েছে। শুরুতে বিনিয়োগ করেছিলেন ৭০ হাজার টাকা। বর্তমানে তার নার্সারিতে থাকা গাছের আনুমানিক মূল্য ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা।
তবে এ পর্যায়ে আসার পথটা সহজ ছিল না। শুরুতে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল তাকে। একসময় যারা তার কাজে বাধা দিয়েছিলেন, তারাই এখন সফলতার জন্য প্রশংসা করেন বলে জানান মেহেদী।
তিনি বলেছেন, ‘আমার পরিকল্পনা আরও বড় পরিসরে নার্সারি গড়ে তোলা এবং সেখানে অন্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।’
ঔষধি গাছ সংরক্ষণকে নিজের উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে দেখেন এই তরুণ উদ্যোক্তা। তিনি জানান, অনেক ঔষধি গাছ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এসব গাছের চারা উৎপাদন ও সংগ্রহের মাধ্যমে তিনি সেগুলো সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন। ইন্টারনেটে বিভিন্ন গাছের উপকারিতা ও চাষাবাদ সম্পর্কে ভিডিও দেখে মানুষ আগ্রহী হচ্ছে। নার্সারিতে সরাসরি গাছ দেখার সুযোগ পেলে ক্রেতাদের আগ্রহ আরও বাড়ে বলে জানান তিনি।
মেহেদীর নার্সারিতে শুধু বাউফল নয়, আশপাশের দশমিনা ও গলাচিপাসহ ভোলা থেকেও ক্রেতারা আসেন। অনলাইনেও চলে গাছের চারা বিক্রি। তার দাবি, অনলাইনে বা বিভিন্ন হাটবাজারে চারা কিনতে গিয়ে অনেক ক্রেতা প্রতারণার শিকার হন। নার্সারিতে সরাসরি এসে চারা কিনলে ক্রেতারা গাছের জাত ও মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ পান।
মেহেদী হাসান বলেছেন, ‘সরকারি আর্থিক সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পেলে নার্সারিটি আরও বড় করতে চাই। যেন মানুষের কাছে বিশ্বস্ত ও মানসম্মত চারা পৌঁছে দিতে পারি। ভবিষ্যতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে ঔষধি গাছের চারা বিদেশেও রপ্তানি করার স্বপ্ন দেখি।’
চাকরির পেছনে না ছুটে কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া মেহেদী হাসানের এই উদ্যোগ স্থানীয় তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে। তার লক্ষ্য, নিজের উদ্যোগকে আরও সম্প্রসারণের পাশাপাশি ঔষধি গাছ সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা।
বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মিলন জানান, প্রধানমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সেই কর্মসূচির আওতায় ঔষধি গাছও রয়েছে। ঔষধি গাছের চারা বিতরণসহ বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচির মাধ্যমে এ ধরনের গাছ রোপণে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তিনি বলেছেন, ‘ঔষধি গাছের মধ্যে নিম অত্যন্ত উপকারী একটি উদ্ভিদ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ঔষধি গাছের গুরুত্ব বিবেচনায় বৃক্ষরোপণের কোনো বিকল্প নেই। বাউফলের মেহেদী হাসানের নার্সারিতে বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি গাছের চারা পাওয়া যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের ঔষধি গাছ রোপণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’




