রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নজর কাড়ছে বিরল ফলসাগাছ

আগেকার দিনে রাস্তার ধারে ও বন-বাদাড়ে সহজেই ফলসা গাছের দেখা মিলত। এখন গাছটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। যদিও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি গাছ এখনও চোখে পড়ে। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে পশ্চিম দিকে এগোলে দেখা মেলে কেন্দ্রীয় মসজিদের। সেখান থেকে আরও কিছুদূর গিয়ে পরিবহন পুলের উত্তর পাশের দেয়ালঘেঁষা স্থানে দেখা যায় একটি বিলুপ্তপ্রায় ফলসাগাছ। ফুল ও ফলে ভরা গাছটি সেখানে সৃষ্টি করেছে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ।
সহজে দেখা মেলে না বলেই ফলসাগাছে ফুল-ফল ধরার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিদিন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসা নানা বয়সী মানুষ সেখানে ভিড় করছেন। এছাড়া রংপুরে সাংবাদিক স্বপন চৌধুরীর রোপণ করা একটি গাছেও এবার ফলসার ফুল ও ফল ধরেছে, যা আগন্তুকদের দৃষ্টি কাড়ছে।
পথের ধারে কিংবা পতিত জমিতে আপনাআপনিই জন্মে ফলসা। বীজ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি মূলত পাখিরাই করে। শহরে এই গাছ খুঁজে পাওয়া এখন অনেকটাই সৌভাগ্যের বিষয়। ফলটি শিশুদের পাশাপাশি পাখিদেরও আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে কাকের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। ফলসা পাকার মৌসুমে সারাদিনই তাদের বিচরণ দেখা যায়। ধারণা করা হয়, আরও অনেক প্রাণী এই ফল খেয়ে বেঁচে থাকে।
বড় বড় পাতার এই গাছ ডালপালা ছড়িয়ে ছাতার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। তামাটে রঙের নতুন পাতা এ গাছের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলসা মাঝারি আকারের পাতাঝরা গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এটি ছয় থেকে সাত মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর পাতা কাকডুমুরের পাতার মতো খসখসে ও ডিম্বাকৃতি। পাতাগুলো বিপরীতভাবে বিন্যস্ত থাকে এবং কিনারা সামান্য দাঁতযুক্ত। একটি পাতা সাধারণত ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৮ থেকে ১০ সেন্টিমিটার চওড়া হয়।
ফলসার ফুল ছোট, হলদে ও অল্প লোমযুক্ত। ফল মটরদানার মতো গোলাকার এবং প্রথমে ধূসর বর্ণের থাকে। পাকলে তা বেগুনি কিংবা নীলাভ-কালো রং ধারণ করে। গাছের বাকল লম্বা, আঁশযুক্ত ও ধূসর রঙের।
ফলসা তাজা ফল হিসেবে খাওয়া হয়। পাকা ফল দিয়ে শরবত, জুস ও বিভিন্ন কোমল পানীয় তৈরি করা যায়। এর রস থেকে সিরাপও তৈরি হয়। স্বাদে টক-মিষ্টি এই ফলে রয়েছে ভিটামিন এ ও ভিটামিন সি। এছাড়া এতে প্রোটিন, শর্করা, খনিজ পদার্থ, চর্বি, ক্যালসিয়াম ও আয়রনও পাওয়া যায়। ফলসার বাকলের রস জ্বর ও আমাশয় নিরাময়ে ব্যবহৃত হয়। গাছের কাঁচা পাতা গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
টক-মিষ্টি স্বাদের ফলসা আমাদের দেশে স্বল্পপরিচিত একটি ফল। ‘ফলসা’ শব্দটি ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। বাংলায় এর নাম ‘ধামানি’। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ হয়। এর আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। হিমালয়ের পাদদেশে এ গাছ ভালো জন্মে। ফলসা মূলত বুনো ফল হিসেবেই পরিচিত। গ্রামবাংলায় একসময় প্রচুর দেখা গেলেও এখন তা ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে।
বাংলা একাডেমির সহপরিচালক এবং বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবিদ করিম মুন্না জানান, ফলসাগাছ খুব বেশি বড় হয় না। এটি খাটো আকৃতির, পাতাঝরা স্বভাবের ঝোপালো বৃক্ষ। প্রধান কাণ্ড থেকে ডালপালা নিচের দিকে ঝুলে পড়ে। মার্চ-এপ্রিল মাসে ক্ষুদ্র হালকা হলুদ রঙের ফুল ফোটে এবং এক মাসের মধ্যেই ফল পাকে। কখনও কখনও জুন-জুলাই মাসেও ফুল দেখা যায়। কাঁচা ফল সবুজ ও টক স্বাদের হলেও পাকলে লাল এবং পরে কালচে-বাদামি হয়ে যায়। পাকা ফলের স্বাদ টক-মিষ্টি ও সুস্বাদু। ওষুধি গাছ হিসেবেও ফলসার গুরুত্ব অনেক।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও সৌখিন আলোকচিত্রী ড. তুহিন ওয়াদুদ জানান, ‘তৃতীয়বারের মতো এই ফলসা গাছে ফল এসেছে। ক্যাম্পাসের মিডিয়া চত্বরে আরও একটি গাছ আছে। তবে সেটিতে এখনও ফুলের দেখা মেলেনি।’






