হবিগঞ্জের ৮১ শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বন্ধ

সংগৃহীত ছবি
জাতীয় গ্রিডের সরবরাহ বাড়ানোয় গ্যাসের চাপ তলানিতে নেমেছে হবিগঞ্জের ৮১টি শিল্প প্রতিষ্ঠানে। উৎপাদন বন্ধ হয়ে কর্মহীন প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক। সরবরাহ না পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কোম্পানিগুলোর বিদেশি ক্রেতারা।
আজ শুক্রবার সায়হাম গ্রুপ তাদের চারটি প্রতিষ্ঠান, ডেনিমস, কটন, টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলে গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে জানিয়ে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডে (জেজিটিডিএসএল) যোগাযোগ করেও কোনও প্রতিকার পায়নি। বাকিগুলোরও এই একই অবস্থা।
জেজিটিডিএসএল হবিগঞ্জের শাহজীবাজার কার্যালয়ের আওতায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে এই কোম্পানিগুলোর সংযোগ ৪২টি ক্যাপটিভ পাওয়ার; বাকি ৩৯টি শিল্প শ্রেণির।
রোজ ৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন তাদের। শুক্রবার মিলেছে মাত্র ১৪ মিলিয়ন ঘনফুট। কারখানা চালাতে গ্যাসের চাপ প্রয়োজন ১৩০ পিএসআই (প্রতি বর্গইঞ্চিতে প্রায় ৯ বার)। মিলছে ১২ পিএসআই। এতে চলছে না কারখানা।
গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) থেকে ঘনমিটার ৩০ টাকা করে কিনে ১৮ পয়সা কমিশনে শিল্প প্রতিষ্ঠানকে গ্যাস দেয় জেজিটিডিএসএল। কিন্তু সম্প্রতি চট্টগ্রামের এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধে জাতীয় গ্রিডের সংকটে তারা গ্যাস পাচ্ছে না। তাই দিতে পারছে না শিল্প প্রতিষ্ঠানকেও।
জেলার শিল্পাঞ্চলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার ডেনিমস, স্কয়ার টেক্সটাইল, সায়হাম গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, বাদশা গ্রুপ, স্টার সিরামিকস, আরএকে সিরামিকস, আকিজ, বেঙ্গল, বিএইচএল, ম্যাটাডোর, তাফরিদ কটন মিলস, ফার ইস্ট স্পিনিং, সিপি বাংলাদেশ ইত্যাদি। এগুলোতে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কর্মরত।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রামের এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় সংকট দেখা দিয়েছে জাতীয় গ্রিডে। সেখানে সরবরাহ বাড়াতে সিলেট অঞ্চলের শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমিয়ে দিয়েছে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)। ফলে কয়েকটি কারখানা নিজস্ব সক্ষমতায় ধীরগতিতে উৎপাদন ধরে রাখলেও অধিকাংশই বন্ধ রয়েছে। প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন; মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কোম্পানিগুলোর বিদেশি ক্রেতারা।
সরেজমিনে শিল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বেশিরভাগ কারখানার ভেতরে শ্রমিকরা অলস সময় পার করছেন। কর্মকর্তারা কারখানার এদিক-সেদিক পায়চারী করছেন। কোম্পানি চালু রাখার জন্য তারা ফোনে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কথা বলছেন। বেশিরভাগই বিদেশি ক্রেতাদের চাপের মুখে রয়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে একের পর এক অর্ডার বাতিল হয়ে যেতে পারে।
হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের (প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ) এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেন, তাদের প্রাণ ও আরএফএলে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক রয়েছেন। ২০টি ক্যাটাগরিতে কয়েক হাজার প্রকার পণ্য উৎপাদন হয়। গ্যাস না থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। কোনো রকমে কোম্পানি চালু রয়েছে। গ্যাসের সংকট শিগগির নিরসন না হলে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ বলেন, ‘বুধবার বিকেল ৩টা থেকে সরবরাহ শূন্য। বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। একেবারে শাটডাউন করে দেওয়া হয়েছে। এখন কারখানায় কাজ করা তিন হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। অথচ আমাদের কোম্পানি শতভাগ রপ্তানিমুখী। বিদেশি ক্রেতারা হতাশ। রপ্তানির আদেশ বাতিল হতে পারে।’
জেজিটিডিএসএলের শাহজিবাজার কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. খালেদ গণি জানান, একটি-দুটি নয়, প্রত্যেকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান খুদে বার্তা পাঠিয়ে ও ফোন করে কোম্পানি রক্ষার আবেদন জানাচ্ছে। কিন্তু চট্টগ্রাম ও ঢাকার সংকট নিরসনের আগে তাদের জন্য কিছু করার নেই। আমরা কোনো রকমে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালিয়ে রাখতে পারছি।
তিনি আরও জানান, আগামী তিন দিনের মধ্যে এই সংকট দূর হবে বলে মনে হয় না।
জিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. হারুন ভূঁইয়া জানালেন, সবকিছু এখন এলোমেলোভাবে চলছে। সঠিক হিসেব দেওয়া কঠিন। তারপরও বলেন, বর্তমানে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন রোজ ১ হাজার ৬৩৯ মিলিয়ন কিউবিক ফুট। যার বড় অংশ সিলেট অঞ্চলে উৎপাদিত। চট্টগ্রামের এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রীডে সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে সিলেট অঞ্চলে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরবরাহ কমিয়ে জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করা হচ্ছে। আশা করছি শিগগিরই সংকট নিরসন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।






