মেহেরপুরে আর্সেনিকই ‘মহামারী’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তিন দশক ধরে আর্সেনিকের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছে মেহেরপুরের অন্তত ১৩টি গ্রাম। নিরাপদ ও সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন বাধ্য হয়ে আর্সেনিকযুক্ত দূষিত পানি পান করছেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। নিষিদ্ধ ঘোষণা করা নলকূপের পানিই যেন তাদের একমাত্র ভরসা। ফলে শত শত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন আর্সেনিকোসিসে, ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জেলার তিন উপজেলায় আর্সেনিকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৯৮৬ জন। এর মধ্যে মেহেরপুর সদর উপজেলায় এক হাজার ১৭, মুজিবনগরে ৬০৩ ও গাংনী উপজেলায় ৩৬৬ জন। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছে নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ ও শিশুও।
জেলার ষোলটাকা, ভোলাডাঙ্গা, আলমপুর, বেলতলাপাড়া, সুবিদপুর, বুড়িপোতা, তারানগর, জয়পুর, আমঝুপি, মদনাডাঙ্গা, সহগলপুরসহ ১৩টি গ্রাম দীর্ঘদিন ধরে আর্সেনিক দূষণের শিকার। এসব গ্রামের অধিকাংশ নলকূপের পানিতে আর্সেনিক পাওয়া গেছে সহনীয় মাত্রার কয়েকগুণ বেশি। যেখানে পানিতে আর্সেনিকের সহনীয় মাত্রা ৫০ পিপিবি, সেখানে অনেক নলকূপে আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে প্রায় ৩০০ পিপিবি পর্যন্ত, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি আলমপুর গ্রামে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু এ গ্রামেই আর্সেনিকজনিত জটিলতায় মৃত্যু হয়েছে বিভিন্ন পরিবারের অন্তত অর্ধশত নারী-পুরুষের। এখনো সহস্রাধিক মানুষ আর্সেনিকোসিসে আক্রান্ত হয়ে কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন।
দীর্ঘদিন ধরে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করায় অনেকের হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ক্ষত, কালো দাগ ও ঘা। অনেকের ক্ষেত্রে এই রোগ রূপ নিয়েছে ক্যানসারে। স্থানীয়দের হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে জেলায় এ রোগে মৃত্যু হয়েছে শতাধিক মানুষের। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে জেলায় আর্সেনিকোসিস রোগীর সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি।
গ্রামের অধিকাংশ মানুষের শরীরেই আর্সেনিকের ক্ষত রয়েছে অভিযোগ করে বৃদ্ধ সিরাজুল ইসলাম বললেন, ‘আর্সেনিক আমাদের গ্রামে মহামারী রূপ নিয়েছে। কিন্তু আজও আর্সেনিকমুক্ত পানির স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা হয়নি।’
আলমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইদ্রিস আলীর ভাষ্য, ‘আমাদের স্কুলে যে কয়টি টিউবওয়েল স্থাপন করেছিলাম, তার সবগুলোতেই আর্সেনিক। একটি এনজিও থেকে আর্সেনিকমুক্ত পানির ব্যবস্থা করায় কিছুটা রেহাই পেয়েছি। স্কুলে আসা শিশু শিক্ষার্থীরা স্কুলে এসে আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করলেও বাড়িতে গিয়ে আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করতে হয়। ফলে এ গ্রামের অধিকাংশ শিশু আর্সেনিকঝুঁকিতে রয়েছে।’ একই কথা জানালেন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহানাজ পারভীন।
এদিকে স্থানীয়দের মতে, আক্রান্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়তেও অনীহা প্রকাশ করেন অনেকে। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যেরও শিকার হচ্ছেন এসব গ্রামের মানুষ।
আলমপুর গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম জানিয়েছেন, তার পরিবারের প্রায় সবাই আর্সেনিকে আক্রান্ত। পরিবারের কয়েকজন মারা গেছেন ক্যানসারে। তিনি নিজেও দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন এই রোগে। গ্রামের প্রায় সব নলকূপেই আর্সেনিক থাকায় বাধ্য হয়ে সেই পানি পান করতে হচ্ছে। ‘আশপাশের গ্রামের মানুষও আমাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করতে ভয় পান’— যোগ করলেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও বিভিন্ন এনজিওর স্থাপন করা নিরাপদ পানির উৎসগুলোর বেশিরভাগই নষ্ট হয়েছে বহু আগে। কিছু পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হলেও, বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় সম্ভব হয়নি সেগুলো চালু করা।
তবে, জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছে কোনো তথ্য নেই আর্সেনিক আক্রান্তদের। জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দীনের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ না পাওয়ায় এখনো আর্সেনিকমুক্ত পানি সরবরাহের স্থায়ী ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয়।
অন্যদিকে মেহেরপুরের সিভিল সার্জন এ কে এম আবু সাঈদ জানালেন, সরকারিভাবে বরাদ্দ না থাকায় সংরক্ষণ করা হয়নি আর্সেনিকে আক্রান্ত রোগীর পরিসংখ্যান। তবে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হলেও সংকট রয়েছে প্রয়োজনীয় ওষুধের।




